» হাওরের মানুষের জীবন যাপন

প্রকাশিত: ০৪. জানুয়ারি. ২০২২ | মঙ্গলবার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

লেখক – মোঃ শহিদুল্লাহ
বাংলার অপরুপ তার দৃশ্য প্রতিটি চিত্রে তাহার প্রমাণ রয়েছে হাওর অঞ্চলে। কার্তিক মাসে হাওর এর জল শুকায়,তার সাথে সাথে ভাটির আবাদি জমি চাষাবাদ করার জন্য উপযোগী হয়ে উঠে কৃষি কাজে। রবি শস্য আর শাক-সব্জির বুনন কাজে গরুর হাল চাষে ব্যস্ত থাকে গ্রামের কৃষক। তার পাশাপাশি অঘ্রাণে মাটে আমন ধানের নেই কোন বালাই, শুধু পাকা মাঠ আর মাঠ যত দূর চোখ যায় ততোদূর দেখা যায়। হাওরে কোন নবান্নের উৎসব নাই হেমন্তের।
হাওরের কৃষকরা বোরো ফসলের জন্য বাজার থেকে বীজ ধান কিনে এনে বাড়ির সামনে পুকুরে সকালে পানিতে ভিজে রাখা সারা দিন, সন্ধ্যা সময় হলে কৃষকরা পুকুর থেকে বীজ ধানের বস্তা পারে উঠান,তার পর বাড়িতে নিয়ে আসেন।রাতভর থাকার পর পরের দিন সকালে ধান ভিজিয়ে রোদ লাগান,এভাবে পর পর তিন দিনের মধ্যে চারাগাছ উকি দেয় বস্তার মাঝে। এই দিকে হাওর অঞ্চলে জালার চার হাল চাষ করা শেষের দিক,বীজ তলায় ধান চিটানোর পর মাঝে মাঝে প্রতি দিন সকালে গিয়ে ছোট কঞ্চি দিয়ে নাড়া দিতে হয়। যাতে করে দ্রুত চারা গুলো পঁচিশ দিনে পোষ মাসে রোপন করা যাবে শাইল খেতে। গ্রামের কৃষকরা দল বেধে আযানের আগে গরুর হাল জোড়া জোড়া নিয়ে হাইল খেতে লাঙ্গল ও জোয়াল কাঁধে হাওরে মাটে চাষাবাদ করার জন্যে যায় ছুটে। আবার বেলা দশটা সময় গরুর হাল নিয়ে বাড়ি ফিরে ,পোষ মাসের শেষে দিক ধান লাগানো প্রায় শেষ হয়।ধীরে ধীরে চারা গুলো বেড়ে উঠতে লাগলো। তার পর চলে আসে মাঘ মাস, গরম পরে তখন ধান গুলো সবুজ পাতা রং ধারণ করে, একটু একটু সবুজ শ্যামল ছায়া মাঠে নতুন রুপ দেখায়।কৃষকরা পানির সেচ দিতে তৎপর হয়ে উঠে। হাওরের বিল থেকে ভাসা পানি কয়েক দিনের মধ্যে হাওরের রূপ পাল্টে যায়। শুধু মাঠ ভরা বোরো ফসলের দৃশ্য চোখ জুড়ায় মনোরম পরিবেশে দক্ষিণা মৃদু সমীরণে,কৃষকরা ফাল্গুন মাসে বিল শুকায় তখন ধরা পড়ে হাওরের তাজা মাছ, কত সুন্দর লাগে দেখতে শুটকি দিচ্ছে আর পাতিল ভরে জিউল মাছ রাখছে কয়েক দিন পর অল্প অল্প করে খাওয়ার জন্য।হাওরে ফসল রক্ষা জন্যে বেড়ীবাঁধ দেওয়া হয় ফাল্গুন মাসে বেড়ীবাঁধ না দিলে চৈত্র মাসের ধনুনদীর যে জোয়ারে পানি হাওরে ডুকার সম্ভাবনা আছে। এতে বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে তাই সরকারি ভাবে প্রতি বছর বেড়ীবাঁধ দেন সরকার।ফাল্গুন মাসে হাওর অঞ্চলে কৃষকেরা গরুর জন্য প্রতি দিনে লম্বা লম্বা ঘাস কাটতে যায় হাওরের মাঝে,রাখাল ও বৃদ্ধ বনতা তাছাড়া এত সুন্দর হয়ে উঠে হাওরের চকগুলি যা দর্শনিয় মানুষের হৃদয় ছুয়ে যায়।সামনে চৈএের খড়া হাওরে হাটতে হাটতে বেলা শেষ হয়নি বুঝি।কত মাইলের পর মাইল তবুও শেষ হয়না হাওরের পথ,আঁকা-বাঁকা আইলে হাটতে গিয়ে কখন জানি পরে যায় শাইল খেতে কাদার মাঝে।চোখের সামনে বুঝা যায় ঐ তো গ্রামের ঘর গুলো দেখা যাচ্ছে কিন্তু না।হাটতে গেলে অনেক দূর, পথে পথে চোখে পড়ে ছোট – বড় অনেক নদী খাল বিল,শীত কালীন অথিতি পাখির ফালান,যেটি পাখিরা বহুদেশ পারি দিয়ে বাংলা দেশে খাবারের সন্ধানে।অনেক প্রজাতীর পাখি আসতো সেটি আজ বিলুপ্তির পথে, আযানের সময় মানুষের ঘুম ভাঙতো পাখির কিচিরমিচির,নলখাগড়া বাগান প্রায় শেষ, অথিতি পাখির তাকার জায়গায় এখন মানুষ টুক কেটে জমি বানিয়ে ফেলছে হাওরে,বৈশাখে নতুন ধান কাটার জন্য হাওর বাসিরা উজান এলাকায় যেতো বাগি আনার জন্যে। যারা ধান কাটতে আসতো তারা মালিকের জায়গায় তাবুর মতো ঘর বানতো বিশ দিন থাকার জন্য। হাওর অঞ্চলে কৃষককের ধান কাটার নিয়ম হচ্ছে একক কৃষকদের একদিন।বাগিদের পাওনা হলো বিশ কলই মালিক আর এক কলই হচ্ছে বাগিদের।ধান মাড়াতে আট থেকে দশটি গরু পানজোর দিয়ে মলন দেয়, এভাবেই হাওরে ধান মাড়াই করা হতো।বৈশাখে হাওর থেকে ধান আনার জন্যে একমাত্র বাহক ছিলো গরুর গাড়ি আর মহিষের গাড়ি।এখন মেশিন দ্বারা মাড়ানো আর লড়ির মাধ্যমে ধান বাড়িতে আনা হয়।বৈশাখে ধান কাটা শেষ হলে হাওর অঞ্চলে যত গুলো গ্রাম আছে প্রতিটি গ্রামের গরু উলারা চেরে দেয় সেই বিশাল হাওরে ঘাস খাওয়ার জন্যে, আবার প্রত্যেক কৃষকরা সন্ধ্যার আগে গরু খুঁজে নিয়ে আসে বাড়িতে।বর্ষার পানি যতদিন পযন্ত না আসবে ততদিন গরু ঘাস খাইতে পারবে হাওরের মাঝে।এদিকে হাওর পারের মানুষের বর্ষা কালে বাড়ি ঘর আফাল বা ঢেউ থেকে রক্ষা জন্যে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয় সেটি হচ্ছে চাইল্লা বন,এই বন দিয়ে বাড়ি বান দিতে হয় ভাটি অঞ্চল গ্রাম গুলো। গৃহস্হর কাছ থেকে কামলাগন বিদায় নিবে,তাই তারা বর্ষাতে না ভাংঙ্গে বাড়ি বান্ধে রাক্কে যান।কাজের লোকেরা এক বছর কাটনি শেষ, আবার কার্তিক মাস আসলে নতুন করে কোন কৃষকের ঘরে বদ্ধ হয়বো। আষাঢ় মাসে হাওর অঞ্চলে নতুন মাএারা দ্বারা কারণ হচ্ছে আষাঢ়ে বাসা পানি হাওরের ভরা যৌবন পূবালী বাতাসে থৈথৈ আর কল ঢেউ এর শব্দ মুখরিত হাওরের বুক,যেন কেউ গা ভিজিয়ে দিচ্ছে নতুন ধারা। হাওরে দুটি বাহক একটি হলো শুকনো পায়ে হেঁটে আর বর্ষা নৌকা বর্ষা দিনে জারির গান আইত আর মাঝি মাল্লা রা কবিয়াল গানে আসর জমে উঠতো তাছাড়া ভাটিয়ালি সুরে গান গেয়ে জেলেরা দাড় টানে বাড়ি ফিরতো।হাওরে ঐতিহ্য বাহী নৌকা বাইচ ছিলো ভাটির মানুষের আনন্দ উৎসব।ময়ূরপঙ্খি নৌকা পানচি গোলই যেই নৌকা জিততো সেই নৌকা ভাটির বাড়ি বাড়ি গিয়ে জারি সারি গান গাই তো।বর্ষাকালে ভৈরব আশুগঞ্জ থেকে বড়সড় বেপারী নৌকা ধান কিন্তে হাওর এলাকায় আসতো।হাওরের মানুষ শুধু বর্ষা কালে বিবাহ সাধী অন্যান্য অনুষ্ঠান করতো। বৈশাখে যে ধান গোলা ভরে রাখছে সেই গুলো বর্ষা আসলে বিক্রি করে থাকে হাওরের কৃষকরা।বিষয় হলো হাওরে মৎসভান্ডার তেমনি কবি লেখক ও সাহিত্যর ভান্ডার,যেমন- শাহ আব্দুল করিম,দূর বিন শাহ, শাহনূর,রাধারমণ,রাম কানাই,হাসন রাজা,কালা মিয়া,আমির উদদীন, রহি ঠাকুর,রমেশ ঠাকুর।বৃহত্তর ময়মনসিংহের বাউল সাধক উকিল মুন্সী,কালীকুমার দাস,চান মিয়া,আবেদ আলী,জংবাদুর কিতাব আলী, কানা সিরাজ, বাউল সাত্তার, ফুল বানু, সুনিল কর্মকার লোক সংগীত কুদ্দুস বয়াতি,সালাম সরকার হবিল সরকা,রসের পিরিত আশরাফ উদাস ভাটির পল্লী শিল্পী।ভাদ্র আশ্বিন মাসে যখন দিন নিরব হাওরে তখন চাইপলে মাছ চাঁদনি রাতে জেলেদের জালে ধরা পরতো। হাওর বাসির জীবিকা নির্ভর একমাত্র বর্ষা সময়ে মাছ আর শুকনায় বোরো ফসল এইদুটি আয়ের উৎস।

Facebook Pagelike Widget