এই মাত্র পাওয়া:

» শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোয় সাঁড়াশি-শুদ্ধি অভিযান সময়ের দাবি

প্রকাশিত: ০৮. সেপ্টেম্বর. ২০২১ | বুধবার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

।।মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান।।

আর্থিক খাতের জন্য নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক। যে ব্যাংকগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১১টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। আর্থিক খাতের জন্য যা মোটেও সুখকর নয়। এ অবস্থা থেকে ব্যাংকগুলোকে বের করে নিয়ে আসা জরুরি।
তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১১টি ব্যাংকের ২৪ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি ছিল। যদিও জুনে ঘাটতি কিছুটা কমে হয় ২৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুয়ায়ী ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। এটা বাধ্যতামূলক।
স্পষ্ট করে বললে একটি ব্যাংকের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ বা ৪০০ কোটি টাকার যেটি বেশি, সেটির ন্যূনতম পরিমাণ হিসাবে মূলধন রাখতে বা থাকতে হয়। আর যদি কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ (১০ শতাংশ) অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তবে তা মূলধন খাতটি হিসেবে ধরা হয়। ঝানু অর্থনীতিবিদদের এটাই স্পষ্ট অভিমত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ১১টি ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি সরকারি, দুটি বিশেষায়িত, চারটি বেসরকারি। দুর্নীতি-অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বাইরে অপঋণ-কুঋণও এর জন্য কম দায়ী নয়। এ জন্য এসব ঋণ আদায়পূর্বক এসব সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হতে পারে।
পরিসংখ্যানমতে, সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি তিন হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ৩৪৫ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের এক হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৬৬৪ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের এক হাজার ৯২৭ কোটি টাকা। বিশেষায়িত দুটি- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১১ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এক হাজার ৫০৬ কোটি টাকা! আর বেসরকারি চারটির মধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এক হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এক হাজার ১৪৬ কোটি টাকা, পদ্মা ব্যাংকের ৪৬১ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ৩২৯ কোটি টাকা।
এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ১৬৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বাইরে এসব ব্যাংক থেকে একটি চিহ্নিত মহল নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্র্নীতির মাধ্যমে টাকা সরিয়ে নেয়। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে যা বেরিয়ে এসেছিল। সমাজের এলিট পার্সন খ্যাতরা এসব টাকা কায়দা করে হাতিয়ে নিয়ে বিদেশেও পাচার করেছে।
আমাদের তথা জনগণের টাকা এভাবে একরকম অবাধে হরিলুট হচ্ছে। একশ্রেণীর লুটেরা ব্যাংকের গচ্ছিত টাকা নিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। তারা শত শত শুধু নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা নয়ছয় করে পার পেলেও মাত্র কয়েক হাজার টাকা কৃষিঋণের জন্য কৃষকের কোমরে রশি পরে। যে কৃষক উদয়-অস্ত পরিশ্রম করে আমাদের মুখের খাবার জোগান। তাদের এ করুণ পরিণতির খবর কে রাখে? বন্যা, খরাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষক হয়তো ফসল হারিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়ে বিপাকে পড়ে। আর জনগণের শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে একটা চিহ্নিত শ্রেণী বেশ আছে। সামাজিক এ বৈষম্য কবে দূর হবে, এ প্রশ্ন অভিজ্ঞ মহলের।
১১টি ব্যাংক কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এগুলো সাধারণ মানুষের জমানো টাকা। এ টাকার মা-বাপ আমজনতা। এই টাকায় সবার হিস্যা আছে। সাধারণ মানুষের এ টাকা নিয়ে ছিনিমিনি লেখার অবসান ঘটাতে হবে। ব্যাংকের টাকা হিসাবের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নেই। হিসাব ধরে টান দিলে সব বেরিয়ে আসবে। ফলে ঋণের বাইরেও কারা কোথায় কীভাবে টাকা তুলে নিয়েছে, তা বের করা কঠিন কিছু নয়। হিসাবের খাতা মিলালেই মূলধন ঘাটতির সব কিছু স্পষ্ট হবে সহজেই। ধরা পড়বে কুচক্রি রুই-কাতলার দল।
আর্থিক খাতের অন্যতম ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলোয় জনগণের জমাকৃত টাকা নিরাপদে রাখা এবং নিরাপত্তা দেওয়া দায়িত্ব যাদের, হালে দেখা গেছে রক্ষকরাই ভক্ষকের ভূমিকায়। শুনতে কষ্ট লাগেও বর্তমানে এটাই সত্য ও বাস্তব। লুটেরা এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। ব্যাংকগুলোয় কাক্সিক্ষত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে মূূলধন ঘাটতি কমিয়ে দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত চিহ্নিতদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি ও শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা সময়ের দাবি।

Facebook Pagelike Widget