» লকডাউনের কারণে ৯১ শতাংশ শিশুই মানসিক চাপ ও যন্ত্রণায় ভুগছে

প্রকাশিত: ২৮. এপ্রিল. ২০২০ | মঙ্গলবার

 

জাতির সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম।।
বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে নভেল করোনা ভাইরাস। এর সংক্রমণ রোধে প্রয়োজন সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা। আর এ কারণে পৃথিবীর সব দেশেই চলছে লকডাউন। এ লোকডাউনের কারণে ভাইরাসের সংক্রমণ কমানো গেলেও বাড়ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। এর জেরে তীব্র সংকটের সম্মুখীন শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য। এক জরিপে দেখা গেছে, লকডাউনের কারণে ৯১ শতাংশ শিশুই মানসিক চাপ ও যন্ত্রণায় ভুগছে। শুধু তা-ই নয়, লকডাউনের কারণে কর্মহীনতায় বাড়ছে

পারিবারিক দারিদ্র্য। এতে শিশুরাও পড়ছে হতাশা ও শঙ্কার মধ্যে। তদুপরি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে শিশুদেরও। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ, শিশুদের রক্ষায় খেলাধুলা ও বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা যেন করা হয়।

নভেল করোনা (কোভিড-১৯) ভাইরাসের সংক্রমণ শিশু ও তরুণদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলেছে তা জানতে গত ২ মাসে উন্নয়নশীল ১৩টি দেশে একটি জরিপ করেছে আন্তর্জাতিক শিশুকেন্দ্রিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন। গতকাল এ জরিপের তথ্য নিয়ে ‘চিলড্রেন ভয়েসেস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিশুরা মানসিক বেদনা ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ, আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ব্রাজিল, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, মালি, মঙ্গোলিয়া, নিকারাগুয়া, পেরু, ফিলিপাইন, রোমানিয়া, সিয়েরা লিওন, তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তের আশ্রয়কেন্দ্রে এ জরিপ চালানো হয়। এতে ১৩টি দেশের ১০১ শিশু ও তরুণের (৮ থেকে ১৮ বছর) সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।

শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক সংগঠন খেলাঘরের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. লেনিন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, লকডাউনে শিশুরা ঘরে বন্দি। একদিকে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিশুরা বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে পারছে না; অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরাও সময় দিচ্ছেন না। এতে তাদের হতাশা, আতঙ্ক, শঙ্কা ইত্যাদি থেকে মানসিক সমস্যার মধ্যে পড়ছে। শিশুদের বিকাশমান সত্তা মানসিক সংকটে পড়লে তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত শিশুদের সঙ্গে খেলা করা, বই পড়া, কার্টুন দেখা ইত্যাদি বিনোদনমূলক কর্মকা-ে যুক্ত থাকা।

এদিকে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সাধারণ ছুটি শুরু হয়েছে ২৬ মার্চ থেকে, যা কার্যত লকডাউন। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশুরা খুন, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষা নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকের ঝরে পড়ার শঙ্কাও রয়েছে। এই বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চলমান মহামারীতে আমরা বিভিন্ন জেলা থেকে খবর পাচ্ছি নারী নির্যাতন বেড়েছে। এটা রোধ করতে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। মহামারীর ফলে স্কুল থেকে অনেকে ঝরে পড়বে। মহামারীর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বিপাকে। এদের মধ্যে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এই সময়ে সমাজের দুর্বল শ্রেণির শিশু-নারীদের বিশেষ নজরদারি আওতায় আনতে হবে।

ওয়ার্ল্ড ভিশন তাদের প্রতিবেদনে মহামারীর সময়ে জীবনে ছন্দপতনের জন্য সরাসরি তিনটি কারনকে উল্লেখ করেছে। এগুলো হচ্ছেÑ শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, সামাজিক দূরত্বের কারণে মানসিক বেদনা এবং পরিবারে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া। শতকরা ৭১ ভাগ শিশু ও তরুণ বলছে স্কুল বন্ধের কারণে তারা বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ অনুভব করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা হারিয়ে ফেলায় শিশু ও তরুণরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লকডাউন দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধাবঞ্চিত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুরা পড়াশোনা করতে পারছে না, যা তাদের অনেক সহপাঠীরা করছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশু এখন বঞ্চিত স্কুল মিল থেকে। অভিভাবকরা চাকরি বা জীবিকা হারিয়ে সন্তানদের খাবার জোগাড়ে অক্ষম হয়ে পড়ছে।

ওয়ার্ল্ড ভিশন পার্টনারশিপের অ্যাডভোকেসি ও এক্সটারনাল এনগেজমেন্টের প্রধান মিসেস ডানা বুজডুসিয়ে বলেন, শিশুরা এ পরিস্থিতে দ্বিধা, ভয় এবং হতাশা থেকে তারা বন্ধু এবং স্বজনদের সাথে যোগাযোগও করতে পারছে না। যেসব দেশে জরিপ পরিচালিত হয়েছে, সেখানে দারিদ্র ও বিশুদ্ধ পানির অভাব বিদ্যমান, যা কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে শিশুদের মনেও উদ্বেগ বাড়ছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৯১ ভাগ শিশু স্বীকার করেছে এই অনিশ্চয়তা এবং বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে তারা উদ্বেগ, রাগ, শঙ্কাসহ নানা ধরনের মানসিক চাপে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শিশুরা অসহায় নয়, তারা এই মহামারীর অদৃশ্য শিকার। তার পরিবর্তনের শক্তিশালী অনুঘটক। শিশুরা সবার সাথে মিলেমিশে তাদের সমাজের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। সামাজিক পরিবর্তনে শিশু ও তরুণদের অংশগ্রহণ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং তারা অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়Ñ এই বোধ তাদের সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

প্রতিবেদনে কঙ্গোর শিশু অনিতার বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, এমন পরিস্থিতি মোটেও ভালো লাগার কিছু নয়। ইবোলা শেষে আমার এমন সময়টা শেষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আবার করোনা ভাইরাস শুরু হয়েছে। যদিও বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে সে থাকলে ভাইরাসের হাত থেকে হয়তো আমরা রক্ষা পাব; কিন্তু খাবারের অভাবে আমরা মরেও যেতে পারি।

এদিকে প্রতিবেদনে শিশুরা সংক্রমণ প্রতিরোধে কাজ করতে চায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মানসিক চাপের অনুভূতি সত্ত্বেও শিশু এবং তরুণরা নিজেদের কমিউনিটিতে কোভিড ১৯-এর বিস্তার প্রতিরোধের লড়াইয়ে অবদান রাখতে চায়। শিশুরা বলেছে যে অনলাইন এবং অন্যান্য দূরবর্তী সহযোগিতার মাধ্যম ব্যবহার করে ভাইরাসের বিস্তার থেকে রক্ষা পেতে মানুষকে সচেতন করতে শিশুদের সম্পৃক্ত করা খুবই প্রয়োজন ছিল।