» রাজধানীর বস্তি, বিহারি ক্যাম্প ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রোগী বাড়তে থাকায় ঢাকায় ‘গণসংক্রমণ’ হতে পারে

প্রকাশিত: ২৫. এপ্রিল. ২০২০ | শনিবার

জাতির সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম।।    রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে নভেল করোনা ভাইরাসের বিস্তৃতি ঘটছে। দেশের মোট রোগী ৫০.৫৯ শতাংশ এই নগরীতে। ঢাকা বিভাগে তা ৮৬ শতাংশ। সারাদেশের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীর পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেভাবে পরিস্থিতি যাচ্ছে, তাতে রাজধানীর বস্তি, বিহারি ক্যাম্প ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রোগী বাড়তে থাকায় ঢাকায় ‘গণসংক্রমণ’ হতে পারে।

সরকার সংশ্লিষ্ট সূত্র গুলো বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকায় পরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকার যেসব জায়গায় রোগী বেশি সেসব জায়গায় রোগী শনাক্তের জন্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে সারাদেশে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ৮০ শতাংশের বেশি ঢাকায়। এ কারণে রাজধানীতে রোগী সংখ্যাও বেড়েছে অনেক।

advertisement
দেশে ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত ৫০৩ জন শনাক্ত করা হয়েছে, যা দেশে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী। নতুন রোগীর ৭৫ শতাংশ হচ্ছে ঢাকা শহরের। আর সারাদেশের রোগী হচ্ছে ২৫ শতাংশ। দেশে এই পর্যন্ত ৪ হাজার ৬৮৯ জন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশ হচ্ছে ঢাকা বিভাগের রোগী। আর বাকি সাতটি বিভাগের রোগী হচ্ছে ১৪ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের হার ঢাকায়

সবচেয়ে বেশি। এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ঢাকায় লজডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ ঘোষিত লকডাউন অমান্য করে জড়ো হচ্ছে, হাটে-বাজারে যাচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর ফলে সংক্রমণ কমছে না। প্রতিনিয়ত সংক্রমণ বেড়ে চলছে।

জানা গেছে, ঢাকায় সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সরকার ঢাকায় অবস্থানরত মানুষের করোনা পরীক্ষার ওপর বেশি জোর দিয়েছে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় ১০টি ও ঢাকার বাইরের ১১টিসহ মোট ২১টি প্রতিষ্ঠানে কারোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব সেন্টারে মোট ৩ হাজার ৬৮৬টি নমুনা পরীক্ষার করা হয়ছে। এর মধ্যে ঢাকার ২৫৬০টি এবং ঢাকার বাইরে ১১২৬টি পরীক্ষা রয়েছে। আগের দিন সারাদেশে মোট পরীক্ষা করা হয়েছে ৩ হাজার ৪১৬ জনের নমুনা। এর মধ্যে ঢাকায় ২ হাজার ৩৭০। ২২ এপ্রিল ৩ হাজার ৯৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়, যার মধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ৯৭৯। ২১ এপ্রিল সারাদেশে ২ হাজার ৯৭৪ জনের নমুনা সংগ্রহের মধ্যে ঢাকায় সংগ্রহ করা হয় ২ হাজার ১৪ জনের। এর আগের দিন ২০ এপ্রিলের চিত্রও তা-ই।

এই পর্যন্ত সারাদেশের ৩৯ হাজার ৭৭৬ জনের পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় পরীক্ষা করা হয়েছে ২৭ হাজার ৫৮৮ জন এবং ঢাকার বাইরের ১২ হাজার ১৮৮ জন।

এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের অতিরিক্ত পরিচালক নাসিমা আক্তার বলেন, ঢাকায় সংক্রমণ বেশি। দেশের বাইরে থেকে আসা প্রবাসীদের বেশিরভাগ ঢাকায় ছিলেন। তারা অন্য মানুষের সংস্পর্শে গেছেন। সে কারণে কন্ট্রাক্ট ও সাসপেক্টেড ঢাকায় বেশি। এ জন্য ঢাকাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অবশ্য রোগীদের অনেকেই অভিযোগ করে আসছেন, ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে যেসব প্রতিষ্ঠানে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট সংখ্যা পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহের পর ওইদিন অন্য কোনো সন্দেহভাজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয় না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রিভেন্টিভ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, কম নমুনা পরীক্ষায় যে আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া গেছে ঢাকায়, তাতে তা গণসংক্রমণ ঘটাতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রোগীর সংখ্যা বাড়লে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে। এ অবস্থায় কী পরিমাণ রোগী হতে পারে, কতজনকে আইসিইউতে নেওয়া লাগবে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতাত্ত্বিক প্রাক্কলন অনুমান নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০ এপ্রিল মোট রোগী ছিল ২৯৪৮ জন। ঢাকা বিভাগে মোট রোগী ২২৮০ জন। এর মধ্যে রাজধানীর ১১৭৪ জন এবং ১৩টি জেলায় ১১০৬ জন। শতকরা হিসেবে ঢাকা বিভাগের রোগী ৭৭.৪০ শতাংশ। পরদিন ২১ এপ্রিল মোট রোগী ছিল ৩৩৮২ জন। ঢাকা বিভাগে মোট রোগী ২৪৫২ জন। এর মধ্যে রাজধানীর ১২২৯ জন এবং ১৩টি জেলায় ১২২৩ জন। শতকরা হিসাবে ৭২.৫০ শতাংশ রোগী ঢাকা বিভাগের। এর মধ্যে রাজধানীর ৩৬.৩৪ শতাংশ আর জেলায় ৩৬.১৬ শতাংশ।

২২ এপ্রিল মোট রোগী ছিল ৩৭৭২ জন। ঢাকা বিভাগে মোট রোগী ২৭৫৪ জন। এর মধ্যে রাজধানীর ১৪৭০ জন এবং ১৩টি জেলায় ১২৮৪ জন। শতকরা হিসাবে ৮৫.২৬ শতাংশ রোগী ঢাকা বিভাগের। এর মধ্যে রাজধানীর ৪৫.৫১ শতাংশ আর জেলায় ৩৯.৭৫ শতাংশ।

২৩ এপ্রিল মোট রোগী ছিল ৪১৮৬ জন। ঢাকা বিভাগে মোট রোগী ৩০৬৫ জন। এর মধ্যে রাজধানীর ১৬৮৩ জন এবং ১৩টি জেলায় ১৩৮২ জন। শতকরা হিসাবে ঢাকা বিভাগের রোগী ৮৫.৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে রাজধানীর ৪৬.৮৭ শতাংশ আর জেলায় ৩৮.৪৯ শতাংশ।

২৪ এপ্রিল ঢাকা বিভাগের রোগী ছিল ৪৬৮৯ জন। ঢাকা বিভাগে মোট রোগী ৩৫০২ জন । এর মধ্যে রাজধানীর ২০৬০ এবং বিভাগের ১৩টি জেলার ১৪৪২ জন। শতকরা হিসাবে ঢাকা বিভাগের রোগী ৮৬ শতাংশ। এর মধ্যে রাজধানীর ৫০.৫৯ শতাংশ আর বিভাগে ৩৫.৪১ শতাংশ।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, চলতি বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত তিনজন রোগী শনাক্ত হয়। এসব রোগী ছিল ঢাকা ও মাদারীপুর জেলার। প্রথম দিকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুর ক্লাস্টার এরিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংক্রমণ রোধে ক্লাস্টার এরিয়া লকডাউন করে স্থানীয় প্রশাসন। লকডাউন করার পর ক্লাস্টার এরিয়া মাদারীপুরে সংক্রমণ বিস্তার বেশি না হলেও ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় সংক্রমণ বাড়তে থাকে। এর পর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ বিভিন্ন স্থানে যাওয়ায় সেখানে সংক্রমণ ছড়াতে থাকে। এর মধ্যে বেশি সংক্রমণ ছড়াতে থাকে গাজীপুর, নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জ জেলায়। বর্তমানে জেলাগুলোয় প্রতিনিয়ত করোনার সংক্রমণ বেড়ে চলছে।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত দেশে ৪ হাজার ৬৮৯ জন রোগী শনাক্ত হয়। দেশে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছে গেল ২৪ ঘণ্টায়। ওই সময় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ৫০৩ জন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭৭ জন ঢাকার। আর সারা দেশের বাকি ১২৬ রোগী। নতুন শনাক্তকৃত রোগীর ৭৫ শতাংশ হচ্ছে ঢাকার আর বাকি ২৫ শতাংশ হচ্ছে সারাদেশের।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, দেশে এই পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের শনাক্তকৃত রোগীর ৮৬ শতাংশ হচ্ছে ঢাকা বিভাগের। আর বাকি সাতটি বিভাগের রোগী হচ্ছে ১৪ শতাংশ। ঢাকা বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী হচ্ছে ঢাকা শহরে (রাজধানী)। অর্থাৎ মোট করোনা রোগীর ৫০ দশমিক ৫৯ শতাংশ হচ্ছে রাজধানীর।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, দেশের আটটি বিভাগের এই পর্যন্ত শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৬৮৯ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ৩৫০২ জন। মোট রোগীর ৮৬ শতাংশ হচ্ছে ঢাকা বিভাগের। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের ১৫৬ জন, মোট রোগীর ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সিলেট বিভাগে ৪৯ জন, মোট রোগীর ১ দশমিক ২০ শতাংশ। রংপুর বিভাগে ৭০ জন, মোট রোগী ১ দশমিক ৭২ শতাংশ। খুলনা বিভাগে ৩৮ জন, মোট রোগীর শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ। ময়মনসিং বিভাগের ১৩৯ জন মোট রোগীর ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে ৮৬ জন, মোট রোগীর ২ দশমিক ১১ শতাংশ। দেশে সর্বোচ্চ রোগীর মধ্যে রাজধানীতে ২০৬০ জন, নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫৬৬ জন, গাজীপুর জেলার ২৯৪ জন, কিশোরগঞ্জ জেলার ১৮০ জন, নরসিংদী জেলার ১৪১ জন, ঢাকা জেলার ৬৪ জন, মুন্সীগঞ্জ জেলার ৬৩ জন এবং ময়মনসিংহ জেলায় ৬৮ জন রয়েছে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে দেশের কোভিড-১৯ সম্পর্কিত সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৬৮৬টি নমুনা পরীক্ষা করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ৫০৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত করোনায় মোট শনাক্ত হলেন ৪ হাজার ৬৮৯ জন। দেশে ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে মোট মৃতের সংখ্যা ১৩১ জন। যারা মারা গেছেন তাদের চারজনই পুরুষ এবং বয়স ৫১ থেকে ৬০-এর মধ্যে। তারা সবাই ঢাকার। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন চারজন এবং এখন পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ১১২ জন।

ইফতার নিয়ে সামাজিক অনুষ্ঠান না করার অনুরোধ জানিয়ে অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, পবিত্র রমজানের সময় এশা এবং তারাবি নামাজের বিষয়ে দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ করছি। একইসঙ্গে ইফতার নিয়ে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান না করার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

রমজানের সময়ে সংযমের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। বৃহস্পতিবার শনাক্ত হওয়া ৪২৪ জনের পর শুক্রবার ৫০৩ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। কেবলমাত্র জনসাধারণের সহযোগিতা পেলেই নতুন শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা কমতে পারে, নয়তো এ সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার হার শতকরা সাত দশমিক ৯ শতাংশ আগের দিনের চেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে ৩৯ হাজার ৭৭৬টি।

বুলেটিনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে আছেন ১২৩ জন, মোট আইসোলেশনে আছেন ৯৯৫ জন, গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশন থেকে ছাড়া পেয়েছেন ২৮ জন, আইসোলেশন থেকে ছাড়া পেয়েছেন মোট ৬২২ জন।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত মোট কোয়ারেন্টিনে ছিলেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৬ জন এবং ছাড়া পেয়েছেন ৮৯ হাজার ১১২ জন। বর্তমানে কোয়ারেন্টিনে আছেন ৮২ হাজার ৭৩৪ জন।