এই মাত্র পাওয়া:

» ভেজালের দৌরাত্ম্যে মানসম্মত নিরাপদ খাবার অধরাই থাকছে

প্রকাশিত: ১৪. সেপ্টেম্বর. ২০২১ | মঙ্গলবার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

।।মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান।।

খাবার হিসেবে মানুষ প্রতিদিন যা গ্রহণ করছে, তা কতটুকু নিরাপদ- সে প্রশ্ন থেকে যায়। খাবারের গুণগতমান কতটা বজায় থাকছে, সে প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে চলে আসছে। সর্বত্র অবাধ ভেজালের দৌরাত্ম্যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বোদ্ধা মহল ও সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে। মানহীন খাবার গ্রহণ করে মানুষ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। খাবারের নামে বিষ গ্রহণের কাজটি নিজের অজান্তেই ঘটে চলেছে।
ভেজাল এতটাই সীমা ছাড়িয়ে যে, চারজন সচিব মুক্তিযুদ্ধের সনদ নেন জালিয়াতির মাধ্যমে! এত বড় ভয়াবহ অমার্জনাকর জালিয়াতির পরও যাদের বিচার হয়নি আজও! এমনকি মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিদেশীদের সম্মাননা হিসেবে দেওয়া সোনার মেডেলে ভেজাল করতেও ছাড়িনি আমরা। আমাদের আকাশসম গৌরব ও অহঙ্কারকে নিয়ে এভাবে যারা নোংরা খেলায় নিয়োজিত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ভেজালের দৌরাত্ম্য থামছে না বলে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত।
আমাদের দেশে শুধু নয়, পৃথিবীর কোথাও মিনিকেট নামক কোনো ধান নেই। আর উৎপাদনও হয় না। অথচ মিনিকেট চাল বাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে! এ নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন নেই। নেই এ নিয়ে কোনো রকম সতর্ক পদক্ষেপ। কারোই যেন এটা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। অথচ বাজারে মিনিকেটের জয়জয়কার। কথিত উচ্চস্তরের মানুষ মিনিকেট চাল কিনতে উৎসাহী। জানা গেছে, মোটা চালকে মেশিনে সরু করে মিনিকেট বলে অবাধে বাজারজাত করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে র‌্যাবের কয়েকটি অভিযানে বড় বড় নামকরা হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাবাব হিসেবে ব্যবহার করা গোশতে ভেজাল পাওয়া গেছে। ব্যবহৃত বেশির ভাগ মাছ ও গোশতই পচা। আর এসব মুখ রোচক খাবার দেদার ভক্ষণ করে জটিল-কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সুষ্ঠু নজরদারির অভাবে পচা-বাসি খাবার বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া রাস্তার পাশে অবাধে বিক্রি হচ্ছে পচা-বাসি খাবার ও শরবতের নামে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর পানীহ। এসব ভক্ষণ ও পান করে মানুষ পেটের পীড়া, জন্ডিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
দায়িত্বশীলদের সঠিক নজরদারী ও তদারকির অভাবে হাট-বাজার মানহীন খাবারে সয়লাব। হলুদের গুঁড়ায় ইটের গুঁড়া মিশানো, ধনিয়ার গুঁড়ায় কাঠের গুঁড়ার মিশ্রণ, খাবারে ক্ষতিকর রং মিশানো, ঘিয়ের মধ্যে ক্ষতিকর দ্রব্যের উপস্থিতির প্রমাণ মিলছে অহরহ। মৌসুমী আম, জাম, লিচু ছাড়াও আপেল, খেজুর, মাল্টা, আঙুরসহ শাকসবজিতে এমনকি মাছে নানা ধরনের ফরমালিন ও রাসায়নিক মিশ্রণের ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। যেসব উপাদান মানদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ।
এসব ক্ষতিকর খাবার গ্রহণের ফলে ক্যান্সার, খাদ্য পরিপাকে বাধা, যকৃতের অ্যানজাইম নষ্ট করে, পাকস্থলির ক্ষতি করে গ্যাসট্রিক আলসার সৃষ্টি। এতে কিডনি ও লিভার অকার্যকর হয়ে পড়ে। চুলকানি থেকে চোখ, ত্বক থেকে শুরু করে অনেক জটিল রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ ভেজাল মিশ্রিত খাবার।
বেঁচে থাকার জন্য মানুষ নিয়ম করে খাদ্য গ্রহণ করে। অথচ সে খাদ্যে ভেজাল চলে প্রকাশ্যে। শিশুখাদ্যও এর ঊর্ধ্বে নয়। আজকের বাস্তবতায় ভেজালহীন খাদ্য পাওয়া মুশকিল বৈকি। ভেজা এতটাই বৃদ্ধি ও অপ্রতিরোধ্য যে, জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল মিলছে। সম্প্রতি পুরান ঢাকায় এমন ভেজাল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে! ভেজালের দৌরাত্ম্যের বড় প্রমাণ বৈকি।
মানুষকে ভেজাল মুক্ত সতেজ খাবার নিশ্চিতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর রয়েছে। রয়েছে স্যানিটারি ইন্সিপেক্টর। খাবারের মান নির্ণয় ও তদরকির জন্য আছে প্রতিষ্ঠানও। যাদের দায়িত্ব মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিতে নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি পরিচালনা। যাদের কর্তব্য ভেজালকারী দুর্বৃত্তসম সমাজবিরোধী অসৎ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ। অথচ দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঠিক নজরদারি ও সুষ্ঠু তদারকির অভাবেই সাধারণ মানুষ ভেজাল খাবার গ্রহণ করে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। যে প্রাণ হারানোর দায় ভেজাল মিশ্রণকারীদের মতো তদারকিতে নিয়োজিতদের অবহেলাও কম দায়ী নয়। মানুষের মূল্যবান জীবনকে নিয়ে যারা এভাবে ছিনিমিনি খেলছে, উভয়কে প্রচলিত বিধি মোতাবেক জবাবদিহি ও আইনের আওতায় আনা সময়ের দাবি।

Facebook Pagelike Widget