এই মাত্র পাওয়া:

» বেগম সুফিয়া কামাল একজন পল্লীকবি ও নারীদের আদর্শ

প্রকাশিত: ২০. নভেম্বর. ২০২১ | শনিবার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

।।সাঈদা নাঈম।।

যে সময়টাতে মুসলিম মেয়েরা শিক্ষা-দীক্ষায় ছিল একেবারেই পশ্চাৎপদ ঠিক সে সময়ে আমরা আলোর মশাল হাতে কয়েকজন মহিয়সী নারী পেয়েছি। তাঁদের মধ্যে কবি সুফিয়া কামাল একজন।
সেই সময়ে সুফিয়া কামালের মতো স্বশিক্ষিত ও সমাজপ্রগতি-সচেতন নারীর আবির্ভাব ছিল সমাজের জন্য খুব চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার।
রক্ষণশীল অভিজাত পরিবেশে বড় হলেও সুফিয়া কামালের মনোগঠনে দেশ, দেশের মানুষ ও সমাজ এবং ভাষা ও সংস্কৃতি মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।তিনি বড় হয়েছেন নানাবাড়িতে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তিনি লাভ করেননি। তখনকার পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বাস করেও তিনি নিজ চেষ্টায় হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত। বাড়িতে উর্দুভাষার প্রচলন ছিল। তিনি নিজের তাগিদেই বাংলা ভাষা শিখেন।নানা বাড়ি ছিল শায়েস্তাবাদে। সেখান থেকে ১৯১৮ সালে কবি মায়ের সঙ্গে কলকাতা যান। সেখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) এর সঙ্গে। কিছুদিন পরে তিনি শায়েস্তাবাদ ফিরে আসেন কিন্তু তাঁর শিশুমনে রোকেয়া-দর্শনের সেই স্মৃতি অম্লান হয়ে থাকে; বেগম রোকেয়ার ব্যক্তিত্ব তাঁকে অবিরাম অনুপ্রাণিত করতে থাকে।
মাত্র সাতবছর বয়সে তিনি তাঁর পিতাকে গৃহত্যাগ করতে দেখেছেন। কোনো খোঁজ পাননি তখন। মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের সান্নিধ্যে বড় হোন তিনি।

একাধারে একজন কবি, বুদ্ধিজীবী এবং সমাজনেত্রী আমাদের গর্ব বেগম সুফিয়া কামাল । সুফিয়া কামালের জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে এক অভিজাত পরিবারে। তাঁর পিতা সৈয়দ আবদুল বারি পেশায় ছিলেন উকিল। কবি সুফিয়া কামালের যখন সাত বছর বয়স তখন তাঁর পিতা গৃহত্যাগ করেন। নিরুদ্দেশ পিতার অনুপস্থিতিতে তিনি মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের স্নেহ-পরিচর্যায় লালিত-পালিত হতে থাকেন।

পরবর্তীতে ১৯২৫ সালে বরিশালে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে বেগম সুফিয়া কামালের সাক্ষাৎ হয়। এরপূর্বে গান্ধীর স্বাধীনতা সংগ্রামের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কিছুদিন চরকায় সুতা কাটেন। তিনি এ সময় নারীকল্যাণমূলক সংগঠন ‘মাতৃমঙ্গল’-এ যোগ দেন। এরপর শুরু হয় নতুন জীবন। নতুন চেতনা নিয়ে শুরু করেন আলোর যাত্রা।
বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেন। অসাধারণ একজন মানুষ তাঁর জীবন সঙ্গী হোন। ধীরে ধীরে তাঁর পরিধি বাড়তে থাকে স্বামীর সহযোগিতায়।
তাঁর স্বামীর সঙ্গে কলকাতায় গেলে সেখানে বিশেষ বিশেষ বাঙালি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। কাজী নজরুল ইসলামের সাথে দেখা হয় । তিনি সুফিয়া কামালের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হোন এবং সেগুলি পত্রিকায় প্রকাশের জন্য তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেন। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ১৯২৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশ করেন।

১৯৩১ সালে বেগম সুফিয়া মুসলিম মহিলাদের মধ্যে প্রথম ‘ভারতীয় মহিলা ফেডারেশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালে তাঁর স্বামী মারা যান। ১৯৩৩-৪১ পর্যন্ত তিনি কলকাতা কর্পোরেশন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এই স্কুলেই তাঁর পরিচয় হয় প্রাবন্ধিক আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) এবং কবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬)-এর সঙ্গে।
স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপশি সুফিয়া কামালের সাহিত্যচর্চাও চলতে থাকে। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সাঁঝের মায়া কাব্যগ্রন্থটি। এর ভূমিকা লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।

এর মাধ্যমেই সুফিয়া কামালের কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছর আপনজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ইচ্ছায় তিনি চট্টগ্রামের লেখক ও অনুবাদক কামালউদ্দীন আহমদের সঙ্গে পুনরায় পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। সেই থেকে তিনি ‘সুফিয়া কামাল’ নামে পরিচিত হন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর দমননীতির অঙ্গ হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি তার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষে তিনি ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলন’ পরিচালনা করেন। ১৯৬৯ সালে ‘মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’ (বর্তমানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ) গঠিত হলে তিনি তার প্রতিষ্ঠাতাপ্রধান নির্বাচিত হন এবং আজীবন তিনি এর সঙ্গে জড়িত থাকেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন এবং ভারতের আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার জন্য একটি হাসপাতাল স্থাপন করেন। সুফিয়া, তাঁর স্বামী ও ছেলে দেশের মধ্যেই থেকে যান মুক্তিবাহিনীকে সাহস ও শক্তি জোগানোর জন্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন খবরাখবর সরবরাহের জন্য। যুদ্ধকালীন তিনি একাত্তরের ডায়েরী নামে একটি দিনলিপি রচনা করেন এবং এ সময়ে লেখা তাঁর কবিতাগুলি পরবর্তীকালে ‘মোর যাদুদের সমাধি পরে’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কবিতাগুলিতে তিনি বাঙালিদের ওপর পাকবাহিনীর নৃশংসতা বর্ণনা করেন এবং দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেন। এ সময় রচিত ‘বেণীবিন্যাস সময় তো আর নেই’ কবিতায় মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি মহিলাদেরও আহ্বান জানান।
স্বাধীনতার পরেও সুফিয়া কামাল অনেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন এবং সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা-প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা। এছাড়াও তিনি ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার সভানেত্রী ছিলেন।
তিনি অনেক ছোটগল্প এবং উপন্যাসও রচনা করেছেন।
কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭) তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। তাঁর আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: মায়া কাজল (১৯৫১),
মন ও জীবন (১৯৫৭),
উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪),
অভিযাত্রিক (১৯৬৯) ইত্যাদি।
তাঁর কবিতা চীনা, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান, পোলিশ, রুশ, ভিয়েতনামিজ, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

১৯৮৪ সালে রুশ ভাষায় তাঁর সাঁঝের মায়া গ্রন্থটি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও তাঁর বেশ কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়।
২০০১ সালে বাংলা একাডেমি তাঁর কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে Mother of Pearls and Other Poems এবং ২০০২ সালে সুফিয়া কামালের রচনা সমগ্র প্রকাশ করেছে।

সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানের জন্য সুফিয়া কামাল অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।
১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ নামক জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন; কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন।
তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেন।
১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় এই প্রতিভাবান এবং আলোর সারথী কবির জীবনাবসান ঘটে।
শ্রদ্ধেয় কবি বেগম সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক পরিচিত : সাঈদা খানম মুক্তা, ভাইস চেয়ারম্যান, কুলিয়ারচর উপজেলা পরিষদ, কুলিয়ারচর, কিশোরগঞ্জ।

Facebook Pagelike Widget