এই মাত্র পাওয়া:

» পৃথিবীকে কোথায় ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে করোনা!

প্রকাশিত: ০৬. মে. ২০২০ | বুধবার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

।।আলীমুজ্জামান হারুন।।

প্রকৃতির এমন রুদ্রমূর্তি মানবজাতি এর আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হয় না। এমন না যে পৃথিবীতে এই প্রথম মহামারী দেখা গেল। মহামারী যুগে-যুগে দেশে-দেশে হয়েছে। কলেরা, বসন্ত, প্লেগ মহামারী। সেসব মহামারীর আওতা সীমিত থাকতো নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় বা দেশে। কিন্তু এবারের মহামারী সর্বব্যাপী। পৃথিবীজুড়ে এর হানা। কোথায় পালাবে মানুষ? করোনার দানবীয় তাড়া খেয়ে আমাদের এই প্রিয় গ্রহটাই বা চলেছে কোথায়?
এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই, চিকিৎসাহীন কালব্যাধি করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিভিন্ন দেশ নেয় এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ – লকডাউন। এ অভিনব ব্যবস্থার আওতায় মানুষের জীবনের স্বাভাবিক সব কর্মকাণ্ডই স্থগিত হয়ে যায়। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ হয়ে পড়ে গৃহবন্দী। অচল হয়ে পড়ে সব রকম অর্থনৈতিক কার্যক্রম। এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেল, লকডাউন চলছে।

কিন্তু এভাবে কি চলতে পারে? অর্থনৈতিক কার্যক্রমই যদি চলতে না-পারে, তবে কী খেয়ে বাঁচবে মানুষ? আর লকডাউনই বা কি হতে পারে চিরস্থায়ী কোনো সমাধান? এখন তাই বলা হচ্ছে, এমন সর্বনাশা লকডাউন তুলে না-নিলে করোনায় যত মানুষের মৃত্যু হবে, অনাহারে মারা যাবে তার চেয়ে বেশি মানুষ।

প্রশ্ন উঠেছে, মানবজাতির সামনে এখন কর্তব্য কী – করোনা ভাইরাসের মোকাবিলা, নাকি অর্থনীতির চাকা সচল করা? এ প্রশ্নের জবাবও দু’ধারী তলোয়ারের মতো ; এদিকেও কাটে, ওদিকেও কাটে। যেমন, করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেলে লকডাউন চালিয়ে যেতে হবে, আবার অর্থনীতিতে গতি আনতে গেলে লকডাউন তুলে নিতে হবে।

কেউ-কেউ মনে করেন, এই সংঘাতে দ্বিতীয় পথেই যাওয়া উচিত। একইসঙ্গে অন্তত আগামী এক থেকে দেড় বছর করোনা ভাইরাসের সঙ্গেই সমান্তরাল জীবনযাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অভ্যেস গড়ে তুলতে হবে মানবজাতিকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাদের মেনে নিতে হবে যে, করোনা ভাইরাস আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অঙ্গ।

আর যদি দীর্ঘদিন ধরে লকডাউন চালিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাহলে সারা বিশ্বে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে লকডাউন চালিয়ে যাওয়া হলে এমন একটা সময় আসবে, যখন করোনায় মৃতের সংখ্যাকে ছাপিয়ে যাবে অনাহার ও অপুষ্টিতে মৃত্যু।

ভাবতেও ভয় লাগে, পৃথিবীকে কোথায় ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে করোনা!

এ তো গেল গোটা বিশ্ব নিয়ে আলোচনা। একই ধরনের উভয়সঙ্কটে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতিও। বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা বড় খাত গার্মেন্ট শিল্প। গত কয়েক দশকে দেশের চিত্তাকর্ষক প্রবৃদ্ধিতে এই খাতটি অবদান রেখে চলেছে। গত বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প দেশে এনেছে ৩৪০০ কোটি ডলার, যা জিডিপি-র ১৩ শতাংশ।

করোনা ঠেকাতে বাংলাদেশ কি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ করে দেবে? তা ভাবাও যায় না। আবার খোলা রাখাও এক ভয়াবহ ধারণা।
বাংলাদেশে গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করেন প্রায় ৪১ লাখ শ্রমিক। তারা গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে যেমন বসবাস করে, কারখানায়ও তাদের সেই একই পরিস্থিতি। এ অবস্থা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

গার্মেন্ট কারখানার মালিকদের কারণে এসব শ্রমিক এখন বিভিন্ন বস্তিতে অসহায় দিন কাটাচ্ছেন। এই গার্মেন্ট কারখানা হলো বর্তমানে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল। এখন কাজ না থাকায় এবং ক্ষুধায় ভোগা হাজার হাজার শ্রমিক তাদের বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। কারখানাগুলো যাতে শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারে এ জন্য সরকার স্বল্প সুদে প্রায় ৫৯ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ওই অর্থ পাওয়ার জন্য এখনও অপেক্ষায় মালিকরা।

প্রথমে দীর্ঘ ছুটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেষ্টা করে সরকার। যখন বুঝতে পারে যে, এই ছুটি যথেষ্ট হবে না, তখন ৩১ শে মার্চ পর্যন্ত
ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়। ছুটি ঘোষণার ফলে শ্রমিকদের অনেকে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। কারখানা মালিকদের আহ্বানে তারা ফিরে আসেন। এ সপ্তাহে প্রায় ২০০০ কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে আরো কয়েক শত খুলে দেয়া হবে।
করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বে পোশাকের চাহিদা কমে গেছে। তবু অনেক
কারখানা মালিক মনে করছেন, তাদের পক্ষে কারখানা আর বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। এর ফলে যা কিছু কাজ এখনও বাকি আছে তার শর্ত পূরণে তারা তৎপর হয়েছেন। এখনও কিছু অনলাইন খুচরা ক্রেতা পোশাক কিনছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অংশে লকডাউন শিথিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আবার চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে।

মালিকপক্ষ বলছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ কম্বোডিয়া, চীন, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামের গার্মেন্টগুলো এরই মধ্যে আবার খুলে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় যদি বাংলাদেশি সরবরাহ লকডাউনের অধীনেই রাখা হয় তাহলে ক্রেতারা অন্যকোথাও থেকে তাদের কেনাকাটা শুরু করতে পারে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য হবে বিপর্যয়কর।
ভাবতেও পারি না, পৃথিবীর মতো বাংলাদেশকেও কোথায় ঠেলে নিয়ে যেতে চাচ্ছে করোনা?

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩২ বার

[hupso]
Facebook Pagelike Widget