» পরিবর্তনের ফলে এর রোগসৃষ্টির ক্ষমতা অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে

প্রকাশিত: ২৪. এপ্রিল. ২০২০ | শুক্রবার

জাতির সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম।।    বিশ্বজুড়ে কোডিভ-১৯ মহামারীর জন্য দায়ী করোনা ভাইরাসের (সার্স-কভ-২) মধ্যে কিছু পরিবর্তনের ফলে এর রোগসৃষ্টির ক্ষমতা অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মুশতাক ইবনে আয়ূবের গবেষণায় এমনটি উঠে এসেছে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের এই সহকারী অধ্যাপক তার গবেষণার আলোকে বলছেন, ভাইরাসটির জিনোমে পর পর তিনটি গঠন উপাদান পরিবর্তনের ফলে এর সংক্রমণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। যেসব দেশে এই পরিবর্তন ঘটে যাওয়া ভাইরাস বেশি আছে, সেখানে তুলনামূলকভাবে কম লোক আক্রান্ত হচ্ছে।

ভাইরাসের জিনোমের ২৮৮৮১-২৮৮৮৩ অবস্থানে এএএ-এর অবস্থানে অঅঈ পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপের যেসব দেশে কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে এএএ-এর অবস্থানে অঅঈ পরিবর্তন বেশি দেখা যায়। এ রকম আরও পাঁচটি পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে সার্স-কভ ২-এর সংক্রমণ এবং রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। গবেষণাপত্রটির খসড়া পাওয়া যাবে https://www.preprints.org/manuscript/202004.0337/v1

ড. মুশতাক বলেন, সার্স-কভ ২-এর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করার ব্লুপ্রিন্ট হচ্ছে এর জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল আরএনএ। এই আরএনএর ভেতর মিউটেশনের মাধ্যমে শত শত পরিবর্তন হয়েছে এরই মধ্যে। কিন্তু এ পরিবর্তনগুলোর ভেতর কেবল একটি ক্ষেত্র আছে যেখানে ধারাবাহিক তিনটি অবস্থানে ভাইরাসের জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল পরিবর্তন হয়েছে। সুতরাং এটি একটি অনন্য বিষয়। খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ওই তিনটি পরিবর্তন ভাইরাসের এমন একটি উপাদানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যেটি তার সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিন নামে পরিচিত ওই উপাদানটি একটি ভাইরাস থেকে অনেক ভাইরাস তৈরি হওয়া এবং নতুন নতুন কোষকে আক্রমণ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, অনেক বিজ্ঞানীই সার্স-কভ-২ ভাইরাসকে নানাভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার চেষ্টা করেছেন। আমার গবেষণা পুরো বিষয়টিকে অনেকখানি সহজ করে তুলে ধরেছে। পর পর তিনটি পরিবর্তনকে ভিত্তি করে আমি শ্রেণিবিন্যাস করছি এবং এ রকম ঘটনা ভাইরাসের জিনোমের ৩০ হাজার বেস পেয়ারের ভেতর কেবল ওই তিনটি ধারাবাহিক অবস্থানেই ঘটে। আর সব ক্ষেত্রে সাধারণত আলাদা আলাদা করে একটি করে অবস্থানে পরিবর্তন হয়। তাই আমার শ্রেণিবিন্যসটি একটি স্থিতিশীল ভিত্তি দিচ্ছে, যার আলোকে ভাইরাসের অন্য পরিবর্তনগুলো অনুসরণ করে তাদের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ এবং ফল বিশ্লেষণ করা সহজতর করে তুলবে।

এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- এখানে দেখানো হয়েছে, পৃথিবীর যেসব দেশে এই পরিবর্তন হয়ে যাওয়া ভাইরাসগুলো বেশি পরিমাণে আছে, সেখানে তুলনামূলকভাবে কম লোক আক্রান্ত হচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোর ভেতর জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালিতে কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। অন্যদিকে পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়ামে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। এই দেশগুলোতে ভাইরাসের জিনোমে ওই পরিবর্তন বেশি হয়েছে।

শুধু আক্রান্তের সংখ্যাই নয়, বিভিন্ন দেশে কোভিড ১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যার বড় তারতম্যের বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেছেন ড. মুশতাক। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে কোভিড ১৯-এর প্রকোপ কম-বেশি হওয়ার পেছনে তিনি তার গবেষণায় পাওয়া মিউটেশনগুলোকে দায়ী বলে মতপ্রকাশ করেছেন।

ড. মুশতাক বলেন, গবেষণাটি বাংলাদেশে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের জেনেটিক তথ্য জানার গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে কোন ধরনের সংক্রমণ-ক্ষমতার ভাইরাস আছে, সেটি জানা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা হলে আমরা এই সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি আরও নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারব। সরকারকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ তাদের শতাধিক ভাইরাসের জিনোম তথ্য উদ্ঘাটন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে একটিও হয়নি। দেশের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের নিয়ে এখনই কাজটি করা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন। ড. মুশতাক ইবনে আয়ূবের গবেষণাপত্রটি একটি বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে।