এই মাত্র পাওয়া:

» পরশ্রীকাতরতা ইবলিশের ভূষণ: জসিম তালুকদার

প্রকাশিত: ২৪. নভেম্বর. ২০২১ | বুধবার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা ইবলিসের ভূষণ। দুনিয়ার প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ)-এর প্রতি আল্লাহর রহমত দেখে সে ঈর্ষায় ভোগে। আদম (আঃ)কে আল্লাহ যে মর্যাদা দেন সে তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। এ অস্বীকৃতি ইবলিসকে বিপথগামী করে। এভাবে সে অভিশপ্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই জগৎ-সংসারে যারা হিংসা, বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতায় ভোগে তারা প্রকৃত অর্থে ইবলিসের ঘৃণ্য পথকেই অনুসরণ করে। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা অন্যের ভালো দেখতে পারে না। অন্যের খুশিতে এরা খুশি না হয়ে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার অমঙ্গল কামনা করে। এটা মানুষের একটা বদ স্বভাব। এটা একটি মানসিক রোগ। রোগের নাম পরশ্রীকাতরতা। পর মানে অন্য আর শ্রী মানে সৌন্দর্য, কাতরতা মানে অসুস্থতা; অর্থাৎ অন্যের সৌন্দর্য দেখে যারা অসুস্থ হয়ে পড়েন তারাই পরশ্রীকাতর। কথাটার শব্দগত অর্থই বলে দেয় পরশ্রীকাতরতা একটি মানসিক অসুস্থতা বা ব্যাধি।
সভ্যতাবোধের অভাব ও মানসিক নীচতা থেকে এই রোগের উৎপত্তি। সাধারণভাবে মানুষ হিসেবে অন্যের ভালো দেখে আমাদের সকলেরই আনন্দিত হওয়ার কথা। এটাই মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক আচরণ। সমাজবদ্ধতার কারণে যুগে-যুগে মানুষ একে অন্যের সুখে সুখী, দুঃখে দুঃখী হয়ে এসেছে। এটাকে বলে সহমর্মিতা। যা না থাকলে মানুষের ‘মানুষ’ পরিচয় অর্থহীন হয়ে পড়ে। আর পরশ্রীকাতর মানুষদের মধ্যে এই সহমর্মিতা একবারেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সুতরাং একজন পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মানুষ পরিচয় একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের মন থাকবে আকাশের মত উদার। পরশ্রীকাতরতার মত সংকীর্ণতার সেখানে স্থান হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টি জগতে মানুষের অবস্থান সবার ওপরে, যে জন্য আত্মমর্যাদাবোধের কারণেই মানুষকে তার মনুষ্যত্ব বহাল রেখে চলতে হয়। পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মনুষ্যত্ব বহাল থাকে না।
একজন পরশ্রীকাতর ব্যক্তি কারো ভালো কিছু দেখলে হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরে। তার মনে তখন তীব্র অশান্তি তৈরি হয়, যা তার নিজের জন্যই ক্ষতিকর। এছাড়া সকলের অমঙ্গল চাওয়ার অপরাধে তাকে প্রায় একঘরে হয়েই জীবন পার করতে হয়। অন্যের ক্ষতি চাইতে চাইতে এদের অন্তর তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে হাজার চেষ্টা করেও সেই আবদ্ধ তালা আর খুলতে পারে না। উদারতার অমৃত স্বাদ উপভোগের ক্ষমতা তারা চিরতরে হারিয়ে ফেলে। অন্যের আনন্দে আনন্দিত হতে পারার মধ্যে যে কি স্বর্গীয় আবেশ, তা এদের কাছে চির অচেনাই থেকে যায়। যতদিন তারা বেঁচে থাকে, অন্য সকলের মত মানসিক প্রশান্তি তাদের অধরাই থেকে যায়। সকলের মাঝে থেকেও এরা থাকে বহু দূরে— দ্বীপান্তর কিংবা বনবাসে।

বলছিলাম পরশ্রীকাতরতা একটি মানসিক রোগ। অন্য সকল রোগের মত এ রোগেরও যথাযথ চিকিত্সা রয়েছে। আসুন নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি, আমি পরশ্রীকাতর কি-না। নিজেকে পরশ্রীকাতর মনে হলে উচিত হবে ধর্মীয় আচরণবিধি মেনে চলা, এর পাশাপাশি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে চিকিত্সা শুরু করা। আপাতত নিজের মনকে বলতে হবে পরশ্রীকাতরতা একটা বাজে স্বভাব; আমাকে অবশ্যই এই বাজে স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আপনার পাথরের মত মনটা আস্তে আস্তে নরম করতে থাকুন। অন্য মানুষের সুখ-দুঃখ মন দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করুন। আত্মকেন্দ্রিতা থেকে বেরিয়ে এসে সহজ হয়ে সকলের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করতে থাকুন। কারো ভালো সংবাদ শুনে খুশি হওয়ার চেষ্টা করুন। আপনাকে মনে রাখতে হবে আপনি খুশি না হলেও কারো কিছু যাবে আসবে না। তাছাড়া খুশি না হলে আপনারও কোনো লাভ হচ্ছে না। কাজেই ঝক্কি-ঝামেলায় না গিয়ে আপনার বরং খুশি হলেই লাভ বেশি। কারণ, খুশি হলে মন ভালো আর মন ভালো হলে শরীরসহ সবই ভালো। আপনাকে বারবার স্মরণ করতে হবে আপনি সৃষ্টির সেরা জীব (আশরাফুল মাখলুকাত)। আপনি পশু নন। পশুদের মন থাকে সংকীর্ণ; মানুষের নয়। পরশ্রীকাতরতা সংকীর্ণতার সর্বোচ্চ ধাপ। আগেই বলছিলাম—পরশ্রীকাতরে মানুষের অন্তর তালাবদ্ধ থাকে, সে তালা আর খোলা যায় না। এখন বলছি, আপনি মন থেকে চাইলেই এ তালা কেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তালাও ভাঙতে পারবেন। এ জন্য প্রয়োজন যথাযথ মনোবল। আপনি চাইলেই আপনার মনোবল বাড়াতে পারেন।

আসুন, আমরা সকলেই পরশ্রীকাতরতার মত একটা বাজে স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসি। অন্যের ক্ষতি চাওয়ার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই, প্রশান্তি নেই। নেই আপনার কোনো লাভ। কাজেই এ কাজটাকে অনর্থক কাজ মনে করে এড়িয়ে চলি। তাই আসুন- পরশ্রীকাতরতা পরিহার করে উপভোগ করি মানব জীবনের শ্রেষ্ঠত্ব।

লেখক:-
–ডা. জসিম তালুকদার
(সংবাদকর্মী, কলামিস্ট ও মানবাধিকার সংগঠক)
বাঁশখালী পৌরসভা ৯ নং ওয়ার্ড, বাঁশখালী উপজেলা, চট্টগ্রাম।

Facebook Pagelike Widget