» গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যত অভিযোগ

প্রকাশিত: ১৯. ফেব্রুয়ারি. ২০২০ | বুধবার

জাতির সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম।।     গণপূর্ত    অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলমসহ কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎসহ তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে সীমাহীন অভিযোগ। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী হন মো. আশরাফুল আলম। এর আগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সচিব বরাবর অভিযোগ করেছে গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদাররা। এছাড়াও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী  মোসলেহ উদ্দিন ও ড. মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ। সূত্রমতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন এবং ড. মইনুল ইসলামের সীমাহীন দুর্নীতির ফলে প্রতিষ্ঠানটি নিমজ্জিত হতে বসেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ও গণপূর্ত মন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতির কোনো তোয়াক্কাই করেননি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীসহ এই দুই প্রকৌশলী। তারা বিভিন্ন ঠিকাদার থেকে পার্সেন্টেজ নিয়ে কাজ পাইয়ে দেন। ইতোমধ্যে ড. মঈনুল ইসলাম ও মোসলেহ উদ্দীন সীমাহীন দুর্নীতি করে হাতিয়ে নিয়েছে শতশত কোটি টাকা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে সেগুলোর মাঝে অন্যতম হলো- ঢাকায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে নিযুক্ত থাকার সময় থেকেই তার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুনীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামি কুমিল্লা-৩ আসনের সাবেক এক এমপি, যিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তার কোম্পানি শাহ কনস্ট্রকশনের সাথে আঁতাত করে আশরাফুল আলম কাজ করেছেন চক্ষু হাসপাতালে। ওই কাজের দরপত্রও নিয়ম বহির্ভূতভাবে শাহ কনস্ট্রাকশনকে দেয়া হয়েছে। আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে আরো ঘোরতর অভিযোগ হলো- ৩০০ জন ভাউচারভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দেন তিনি। এছাড়া জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও বর্তমান রাস্ট্রপতি আশরাফুল আলমের দুর্নীতির বিষয়ে জানার পর ১ঘণ্টার নোটিশে জাতীয় সংসদের নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেন। নানা দুর্নীতির মাধ্যমে বহু অর্থ সম্পদের মালিক বনে যাওয়ায় আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে দুদকে মামলাও করা হয়েছে।
এদিকে, গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম ও তার স্ত্রী সাবিনা আলমের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি দুদকের পরিচালক কাজী শফিকুল আলম স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি নোটিশ তাদের গুলশানের বাসার ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে। দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নোটিশে বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে আশরাফুল আলম ও সাবিনা আলমের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়ায় এই নোটিশ দেয়া হয়েছে। নোটিশে আরও বলা হয়, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিক অনুসন্ধান করে কমিশনের স্থির বিশ্বাস জন্মেছে যে, তারা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত স্বনামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাই নোটিশ পাওয়ার ২১ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের নিজেদের, নির্ভরশীল ব্যক্তিদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়দেনা, আয়ের উৎস ও তা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ নির্ধারিত ফরমে দাখিল করতে বলা হয়েছে। আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মেফতাহুল জান্নাত। গত ৩১ ডিসেম্বর গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান আশরাফুল। এর আগে একই অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তিনি। গত বছর ক্যাসিনোকান্ডের ঘটনায় শুদ্ধি অভিযানে গ্রেফতার হন ঠিকাদার জিকে শামীম। এর পরই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। ‘টেন্ডার কিং খ্যাত’ জিকে শামীমকে সরকারি সব বড় বড় টেন্ডার মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে আসে গণপূর্ত অধিদফতরের বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। এর পরই তাদের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে দুদক। সাবেক তিন প্রধান প্রকৌশলীর পাশাপাশি বেশ কয়েকজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আছেন অভিযোগের তালিকায়।
সূত্র থেকে জানা গেছে, আশরাফুল আলম রংপুর ও বগুড়াতে ফাইভ স্টার হোটেল ভাড়া করে জনসভা করে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সম্বর্ধনা নিচ্ছেন। অনেকের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন এতো টাকা তিনি কোথায় পান? অনেকের মতে, সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আশরাফুল আলম গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী পদে নিযুক্ত থাকায় সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলামের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ: অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলাম অতীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ৩ বছরের ছুটি নিয়ে বিদেশ গমন করেন। পরে তিনি বিনা ছুটিতে আরো ৬ বছর বিদেশে ছিলেন। চাকরি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ প্রায় নয় বছর পর দেশে ফিরে তিনি গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ উপঢৌকনের মাধ্যমে ‘ম্যানেজ’ করে আদালতে জাল কাগজপত্র জমা দিয়ে চাকরিতে স্ব-পদে ফিরে আসেন। গত বছরের শেষের দিকে ড. মঈনুল ইসলাকে প্রধান প্রকৌশলী বানাতে বরিশালের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী কাজ  করেছেন। পাশাপাশি গণপূর্ত অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা এক জোট হয়ে তাকে প্রধান প্রকৌশলী বানাতে দৌঁড়ঝাপ করে।  ১. চাকরি জীবনের শুরু থেকেই মঈনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আছে। ১৫তম ব্যাচের সহকারী প্রকৌশলীরা ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর যোগদান করলেও মঈনুল ৯ মাস পর ১৯৯৬ সালের ১২ আগস্ট চাকরিতে যোগ দেন। ২. ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চাকরিতে অনুপস্থিত ছিলেন। ৯ বছর ৮ মাস ২২ দিন অনুপস্থিত থাকায় মঈনুলকে চাকরি থেকে চূড়ান্ত অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য মন্ত্রণালয়ে আপিলের মাধ্যমে চাকরি ফিরে পান তিনি। ৩. গত বছরের ৫ জুন র‌্যাব সদর দফতর নির্মাণকাজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। উত্তরায় র‌্যাব সদর দফতর নির্মাণকাজের টেন্ডার নিষ্পত্তির চেয়ারম্যান ছিলেন মঈনুল। কথিত যুবলীগ নেতা ও বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্সকে র‌্যাব সদর দফতরের নির্মাণকাজ পাইয়ে দেওয়ায় ভূমিকা রাখেন তিনি। বিধি অনুযায়ী প্রকল্পের দরপত্র গণপূর্তের ঢাকা সার্কেল-৩ থেকে আহ্বান ও তৎকালীন ঢাকা গণপূর্ত জোন থেকে মূল্যায়ন দেওয়ার কথা থাকলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গণপূর্তের সদর দফতর থেকে ওই টেন্ডার আহ্বান করে জি কে শামীমকে র‌্যাব সদর দফতরের কাজ পাইয়ে দেন মঈনুল। ৫৫০ কোটি টাকার কাজে সমান সমান অথবা কিছু কমে নেওয়ার কথা। কিন্তু ১০ শতাংশ বেশিতে জি কে শামীমকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। ১৫ শতাংশ কমিশনে এ কাজ করেন তিনি।
৪. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণে ২৬৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকার প্রকল্প ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশিতে ঠিকাদারকে পাইয়ে দেন মঈনুল। ঠিকাদারের কাছ থেকে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমিশন নেন তিনি।
৫. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আবাসিক ভবনের জন্য বালিশসহ ১৬৯ কোটি টাকার কেনাকাটায় দুর্নীতির ঘটনায় মজিদ সন্স কন্সট্রাকশন লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আসিফ হোসেন ও সাজিন কন্সট্রাকশন লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. শাহাদাৎ হোসেনের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ঘটনায় ঠিকাদার আসিফ ও শাহাদাৎ এবং ১১ জন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গত ১২ ডিসেম্বর মামলা হয়। মামলার আসামি সবাই মঈনুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ। মঈনুলের ভূমিকার আসামিরা ৩১ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করতে পেরেছে।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দীনের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ: ১. অষ্টম জাতীয় সংসদে অনিয়ম, দুর্নীতি তদন্তে অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়াকে (ডেপুটি স্পিকার) প্রধান করে সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছিল। ওই কমিটি গণপূর্ত বিভাগের তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু ওই সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়নি গণপূর্ত অধিদফতর। তদন্ত কমিটির সুপারিশে সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার ও ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট আখতার হামিদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে মামলা হলেও তিন প্রকৌশলী ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন। এই তিন প্রকৌশলীর একজন হলেন গণপূর্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দীন আহাম্মদ। ২০০২-২০০৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। ২. তিন দফা পদোন্নতি পেয়ে মোসলেহ উদ্দীনকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হতে সহায়তা করে কথিত যুবলীগ নেতা ও বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীম। ৩. তিন কোটি টাকা খরচ করে গত অক্টোবরে চট্টগ্রাম গণপূর্ত জোন থেকে ঢাকা গণপূর্ত জোনে বদলি হয়ে আসেন মোসলেহ উদ্দীন। ৪. গণপূর্ত অধিদফতরে কমিশন ভোগী হিসেবে পরিচিত মোসলেহ উদ্দীন। ফিফটিন পার্সেন্ট নামে পরিচিতি তার।
জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদফতরের দুই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলাম ও মোসলেহ উদ্দীনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে ড. মঈনুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে। সম্পদবিবরণীও চাওয়া হয়েছে তার কাছে।  দুদক জানায়, দুই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী যুবলীগের কথিত নেতা ও বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম (জি কে শামীম) সিন্ডিকেটের সদস্য। জি কে শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদে ড. মঈনুল ও মোসলেহ উদ্দীনের দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া আরও পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: গণপূর্ত অধিদফতরের আরও পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ পেয়েছে দুদক। তারা হলেন, প্রকৌশলী মো. সামছুদ্দোহা, মো. নজিবুর রহমান, মো. আবুল খায়ের, মো. শামীম আখতার ও মো. শফিকুল আলম। পর্যায়ক্রমে তাদের তলব করা হবে। চাওয়া হবে সম্পদবিবরণীও।

সূত্র- রাজনীতি প্রতিদিন