এই মাত্র পাওয়া:

» কেন এই ঠিকাদারী-উপঠিকাদারী প্রথা ?

প্রকাশিত: ০৮. সেপ্টেম্বর. ২০২০ | মঙ্গলবার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

লেখক – এখলাসুর রহমান

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ (লোহার সেতু) পুনঃনির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ৪৬ কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে৷ জুলাই মাসের শেষ দিকে বরগুনা জেলার আমতলী ও তালতলী উপজেলার ৩৩টি লোহার ব্রিজ সংস্কারের জন্য টেন্ডার আহবান করা হয়। আটটি প্যাকেজে আহবান করা এসব দরপত্রে সব উপকরণের মূল্য উল্লেখ না থাকায় কার্যত কোন ব্রিজের কত বরাদ্দ কত তা নির্ণয় করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে জেলা জুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা৷ তেরোটি জায়গায় ব্রিজের কোনো অস্তিত্বই নেই। এসব ভৌতিক ব্রিজে কেন এই বরাদ্দ৷ এগুলো কে দিলো কারা দিলো? বাঁশের সাকো সংস্কারের জন্য লোহার সেতু সংস্কারের বরাদ্দ! দেশটা কি মগের মুল্লুক হয়ে গেল?এর দায় কে নেবে?

উপজেলার বর্তমান প্রকৌশলী দায়ী করছেন আগের প্রকৌশলীকে৷ তারা এব্যাপারে কিছুই জানেনা বলে দায় এড়াচ্ছে৷ এখন ঢাকা হতে টিম গেছে তদন্ত করে দেখে আবার নতুন টেন্ডার দিতে৷ কিন্তু ৪৬ কোটি টাকার কী হবে? এই অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে দায়ীদের আগে শাস্তি ও টাকা উদ্ধার পরে পুনঃটেন্ডার এটাই কি হওয়া উচিত নয়? এমন করে সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল আর কত? দেশে এত এত বেতন ভোগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার,উপজেলা প্রকৌশলী,প্রকল্প কর্মকর্তা থাকতে এমন অনিয়ম হতে পারলো কিভাবে৷ কেন দরপত্রে উপকরণগুলোর মূল্য লেখা নেই?এসব ভৌতিক ব্রিজ হয়ে গেলো আর সংশ্লিষ্টরা কিছুই জানলোনা৷ এটাও কি সম্ভব?

বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলায় ৪৯২ টি উপজেলা রয়েছে৷ রয়েছে ৪৯২ টি উপজেলা নির্বাহী অফিসার,প্রকল্প কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকৌশলী৷ তাদের রয়েছে আলাদা আলাদা অফিস ও বেতন ভোগী জনবল৷ এসব জনবল থাকতে তবে কেন ঠিকাদার ও উপঠিকাদার প্রথা৷ রাস্তাঘাট মেরামতের জন্য দেখা গেছে, ঠিকাদার ‘সাব-কন্ট্রাক্ট’ দেয় উপ ঠিকাদারকে। সোজা কথায় ঠিকাদাররা উপঠিকাদারদের কাছে এসব রাস্তাঘাটের কাজ ‘বিক্রি করে’ দেয়। এক্ষেত্রে ঠিকাদার লাভবান হয় বিক্রি করে আর ‘উপ-ঠিকাদার’ লাভবান হয় ক্রয় করে কাজ বাগিয়ে নিয়ে৷ কোনো তথ্য নথিপত্রেই উপঠিকাদারদের কোনো প্রকার তথ্য থাকেনা৷ তারা এভাবে আড়ালে থেকেই লাভবান হয়ে যাচ্ছে৷এসব বরাদ্দের অধিকাংশেরই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে৷ অনেক ক্ষেত্রে এমন রাষ্ট্রায়াত্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো প্রকার তথ্য-ফলকও থাকছেনা৷ এমনই বিশৃংখলা চলছে দেশ জুড়ে৷

দেশজুড়ে এত এত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধি থাকতে আবার কেন এই ঠিকাদারী ও উপঠিকাদারী প্রথা? গণপূর্ত,স্থানীয় সরকার,সড়ক ও জনপথ,শিক্ষা স্বাস্থ্য প্রতিটি সেক্টরেই ঠিকাদার ও উপঠিকাদারদের দৌরাত্ম৷

বহুল আলোচিত স্বাস্থ্যখাতের ‘মিঠু সিন্ডিকেট’ ও তার সহযোগীদের দৌরাত্মের বিষয় সংবাদ পত্রের শিরোনাম হয়েছে৷এসব ঠিকাদার, উপঠিকাদার চক্রের ইশারাতেই বদলী, পদায়নসহ নানা উন্নয়ন বরাদ্দগুলো পরিচালিত হয়৷ কেবল এই স্বাস্থ্যখাত নয় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ই এমন করে ঠিকাদার উপঠিকাদারদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে৷রাস্তাঘাটগুলো দিয়ে চলা যায়না৷ যে বৎসর কাজ করে সে বৎসরই তা ভেঙ্গে জনদূর্ভোগের কারণ হয়৷ এরপর এই ঠিকাদার উপঠিকাদার চক্র নতুন বরাদ্দ এনে আবারও লাভের পথ খুঁজতে তৎপর৷ রাস্তা ভাঙ্গলেই তাদের লাভ৷ সরকারী অফিস ভাঙলেই তাদের লাভ৷কারণ তখনই নতুন বরাদ্দ আর ঠিকাদারী উপঠিকাদারী ও লাইসেনন্স বিক্রির ব্যবসা জমে ওঠে৷ অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দের চারভাগের একভাগ অর্থেরই কোন কাজ হয়না৷ তিনভাগই পকেটস্থ হয়ে যায়৷

অফিস ভবন,কোর্ট কাচারী,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,হাসপাতাল ভবন,রাস্তাঘাট,ব্রিজ,কালভার্ট সবকিছুই নির্মিত হয় ঠিকাদার উপঠিকাদারদের মাধ্যমে৷ আরো চলছে ঠিকাদারী লাইসেন্স ভাড়ার রমরমা ব্যবসা। অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নিয়ে লাইসেন্সধারীরা আবার অন্যদের ভাড়া দিয়ে দেয়। এভাবেই লাইন্সেন্স ভাড়া দিয়ে টাকা কামিয়ে যাচ্ছেন তারা। শুধু কি তাই?কেউ কেউ টেন্ডারের কাজ বিক্রি করেও টাকা কামাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ সাব কন্ট্রাকটর নিয়োগ করে টাকা কামাচ্ছেন। এসব হাতবদল বাণিজ্যের কারণে বছরের পর বছর সরকারি প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারছেনা অনেক প্রতিষ্ঠান৷ এসব ঠিকাদাররা কি দেশের জন্য শুভকর না অশুভকর?

এসব ঠিকাদাররা যে দলই ক্ষমতায় যায় তাদেরই তোষণ করে চলে৷ প্রয়োজনে দলও বদল করে ফেলে যদি তারা বুঝে দল বদলে ঠিকাদারী ব্যবসায় বেশি লাভবান হবে৷ এর উদাহরণ জিকে শামীম,সাহেদ সহ আরও অনেকেই৷ একসময় যারা হাওয়া ভবনে যাতায়াত করতো পরবর্তিতে তারাই আওয়ামী লীগ নেতাদের তোষণ করতে থাকে৷ প্রয়োজনে বিএনপি মুছে দিয়ে আওয়ামী কালার মাখতেও তাদের বাঁধেনা৷এখানে তাদের রাজনৈতিক আদর্শিক চেতনার কোনো ব্যাপার নেই৷ ব্যাপার হলো লাভবান হওয়া৷কেন এই ঠিকাদার -উপঠিকাদারী প্রথা?কেন ঠিকাদারের লাইসেন্স ভাড়া দেয়ার প্রথা?এতে কি দেশের ও জনগণের কোন লাভ হচ্ছে না লাভ হচ্ছে কেবল ঠিকাদার উপঠিকাদারদের?এ প্রশ্নটির উত্তর ভেবে জনস্বার্থমুখী দ্রুত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হোক৷ দেশের ভূক্তভোগী জনগণ এমনটিই প্রত্যাশা করছে৷

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩৭ বার

[hupso]
Facebook Pagelike Widget