» একজন করোনা যোদ্ধা ও মানবতার ফেরিওয়ালার গল্প

প্রকাশিত: ২০. এপ্রিল. ২০২০ | সোমবার

 

 

ছোট বেলায় প্রখ্যাত লেখক ইব্রাহিম খাঁর একটি অসাধারণ ছোট গল্প পড়েছিলাম। গল্পটির নাম ‘ভাঙ্গা কুলা’। যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে গল্পটির কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে যখন দেখি কিছু নিবেদিত প্রাণ মানুষ নিঃস্বার্থভাবে নিজের জীবন বাজি রেখে অন্যের সেবা করে। এই গল্পটির সাথে আমার আজকের গল্পের অনেকটা মিল আছে। গল্প বললে মনে হয় ভুল হবে। কারণ আমি বাস্তব ঘটনা তুলে ধরছি। বর্তমানে ‘ভাঙ্গা কুলা’ গল্পটি পাঠ্য বইয়ে কোন ক্লাসে পড়ানো হয় বলে আমার জানা নেই।

গল্পটির মূলবক্তব্য সংক্ষেপে তুলে ধরছি: ‘সারাদেশ ভেসে গেছে প্রবল বন্যায়। লেখকের উপর অফিস থেকে আদেশ হল টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলের মানুষকে সাহায্য করার। লেখক এলাকাটা ঘুরে মানুষের মাঝে রিলিফ বিতরণ শেষে ক্যাম্পে ফেরার পথে একটা ঘটনা শুনলেন। এক লোক অদ্ভুত উপায়ে ১০ জন মানুষকে বাঁচিয়েছেন। একটা ছনের চালার উপর বাচ্চা নিয়ে ১০ জন মানুষ দু’দিন যাবৎ উপোস ছিল। বাড়ির চারিদিকে প্রবল পানির স্রোত থাকায় কেউ কাছে যেতে পারছিল না। একদল ভলান্টিয়ার সেখানে যায় নৌকা নিয়ে। ভলান্টিয়ারদের সর্দারের অসীম সাহসিকতায় রক্ষা পায় তারা। লেখক ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন ভলান্টিয়ার ক্যাম্পের কাছে মানুষের ভিড়। জানতে পারেন সেখানে ভলান্টিয়ারদের সর্দার শুয়ে আছে। একটা নৌকা ডুবে গিয়েছিল লোকটা কোথা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’জন লোককে উদ্ধার করে কিন্তু নিজে হয়রান হয়ে গেছে। ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে লেখক দেখেন শুয়ে থাকা লোকটা বড়মিঞা যে তাকে ৭ বছর আগে নৌকাতে করে নদী পার করে দিয়েছিল। ক্যাম্পের ডাক্তার বড়মিঞাকে দেখে মৃত ঘোষণা করলেন। লেখক তার বিদেহী আত্নার প্রতি সালাম জানিয়ে বললেন, ‘বন্ধু, দুনিয়ার দফতরে যারা মানুষের নাম লিখে রাখে তাদের নজরে পড়বে না জানি। কিন্তু আলিমুল গায়েব বলে যদি কেউ থেকে থাকে, তার দফতরে তোমার কীর্তি নিশ্চয় সোনার হরফে লেখা থাকবে।’’

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। সবাই আতঙ্কিত ও শঙ্কিত। এটা এমনই এক ভাইরাস যে কেউ আক্রান্ত হলে বা মারা গেলে তার পাশে কেউ যাচ্ছে না। অত্যন্ত কাছের মানুষও পর হয়ে যাচ্ছে। অনেকটা চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। সমগ্র বাংলাদেশ করোনা ভাইরাসে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এই দুর্যোগকালীন সময়ে লকডাউনের জন্য অনেকে বাড়ির বাইরে যেতে পারছেন না। খেটে খাওয়া দিনমজুর ও অনেক মধ্যবৃত্ত মানুষও খুব কষ্টের মধ্যে দিয়ে অর্ধাহারে বা অনাহারে দিন অতিবাহিত করছে। এসব অর্ধাহারে বা অনাহারে দিন অতিবাহিত করা মানুষের জন্য লোকজনকে বলে খাবারের ব্যবস্থা করা, বাড়িতে বাড়িতে খাদ্য পৌঁছে দেয়া, অনলাইন ব্লাড ব্যাংকের মাধমে জরুরি রক্তের প্রয়োজনে রুগিকে রক্তের ব্যবস্থা করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সহযোগিতা করা, করোনায় মানুষকে সচেতন করে লিফলেট বিতরণ, বিনামূল্যে গরিব মানুষের মাঝে মাক্স বিতরণ, মসজিদসহ বিভিন্নস্থান অপরিস্কার স্থান ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা, মসজিদে মসজিদে হাত ধোয়ার জন্য সাবান দেয়া, লকডাউনে মানুষকে ঘরে থাকতে সচেতন করা নিজের জীবন বাজি রেখে এমন অনেক কাজ নিঃস্বার্থভাবে করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ উপজেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার এক যুবক যার নাম আব্দুল আলিম।

শুধু করোনা ভাইরাসের সময় নয়; কলেজ জীবন থেকেই নিঃস্বার্থভাবে নিরবে মানুষের সেবা করে আসছেন তিনি। অনেকটা মানুষের উপকার বা সেবা করাই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। মানবসেবার পাশাপাশি এলাকার বেকার যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক ব্যতিক্রমধর্মী ক্যাটারিং সার্ভিস। এই ক্যাটারিং সার্ভিসের নেই কোন মালিক; যেখানে সবাই সমান। প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হয়েও কোন অতিরিক্ত অর্থ নেন না। ক্যাটারিং এ যে আয় হয় তা সমানভাবে ভাগ করে নেন সবাই। নিজের সামান্য আয় ও অন্যের সহযোগিতায় রোজার সময় মসজিদে ইফতারির ব্যবস্থা, মাদ্রসায় গরিব ছাত্রদের কোরআন শরীফ দেন। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি পান করানো এবং কখনও ফুল দিয়ে বরণ করেন। ঈদের আগে এতিম শিশুদের পোশাক কিনে দেন, শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বা শীতের পোশাক বিতরণ করেন। ঘূর্ণিঝড় ফণি, বুলবুলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষকে নিরাপদস্থানে যেতে সহযোগিতা করেন। যে কোন বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন সবার আগে। তার মধ্যে নেই কোন অহংকার। অনেক অসহায় মানুষের আস্থার শেষ ঠিকানা আব্দুল আলিম।

এলাকার অসহায় গরিব মানুষের ক্যান্সার, ব্রেন টিউমার, প্যারালাইসিস, এক্সিডেন্টে বড় করণের কোন ক্ষতি হলে তাদের জন্য মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং প্রয়োজনে সুদূর ঢাকায় হাসপাতালে রুগিকে নিয়ে যান। অত্যন্ত সৎ ও সাদা মনের মানুষ আব্দুল আলিমের এই মহৎ কাজের জন্য দেশ বিদেশের অনেক প্রবাসী তার মাধ্যমে সহযোগিতা করেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম এই আব্দুল আলিমের। বাবা অমেদ আলী ও মা জাহানারা বেগমের ৬ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট আব্দুল আলিম। বলতে পারেন ছোট মিঞা। বয়স খুব বেশি হবে না ২৬ কি ২৭ হবে। শ্যামনগর সরকারি মহসিন ডিগ্রি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করেছেন। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় ভালো করে লেখাপড়াও করতে পারেননি। তার একটি বড় বৈশিষ্ট্য নিজে না খেয়ে থাকলেও কখনো নিজের জন্য কিছু চায় না। চাকরি খুঁজছেন কিন্তু অর্থের অভাবে ভাগ্য সুপ্রন্ন হচ্ছে না। নিজে একজন শিক্ষিত বেকার হয়েও সমাজের মানুষের জন্য নিরলসভাবে স্বেচ্ছায় যে অক্লান্ত শ্রম ও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। অসহায় মানুষের পাশে থেকে তাদের জন্য কিছু করতে পারলে আনন্দ খুঁজে পান তিনি। এলাকার অনেক বেকার যুবকদের আদর্শ এখন আব্দুল আলিম। তবে তাঁর মায়ের খুব দুঃখ ছেলেটার একটি ভালো চাকরি না হওয়া। দেশের দুর্যোগকালীন সময়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আব্দুল আলিমের মত নিঃস্বার্থ পরোপকারী উদ্যোমী যুবকের সারাদেশে খুব প্রয়োজন।

লেখক: এম. এ. আলিম খান, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী