» উত্তাল সমুদ্র জয় করা এক সংগ্রামী নারীর গল্প

প্রকাশিত: ০৮. মার্চ. ২০২০ | রবিবার

আফরিন আপ্পি  , জাতির সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম।। 

অন্ধকার সমুদ্রে মেয়ে মানুষ জাহাজ চালাবে কীভাবে’, এমন কথাও শুনতে হয়েছে তাকে

 সমুদ্রের নীল জল আর খোলা আকাশ ভীষণ টানতো তাকে। স্বজনদের মধ্যে কেউ কেউ জাহাজে চাকরি করায় ছোট থেকে জাহাজ আর সমুদ্রের গল্প শুনতেন আগ্রহ নিয়ে। ভাবতেন একদিন তিনিও চাকরি নেবেন সেখানে।

বড় হওয়ার সাথে সাথে ছোটবেলার সেই ইচ্ছেটাও ডানা মেলতে থাকে একটু একটু করে। পরিবারের সদস্যদের সাথে প্রায়ই বেড়াতে যেতেন চট্টগ্রামের মেরিন অ্যাকাডেমিতে। সেখানে ক্যাডেটদের ইউনিফর্ম, সুশৃঙ্খল জীবন, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি মুগ্ধ চোখে দেখতেন। ভাবতেন ‘কেন এখানে মেয়েদের নেয়া হয় না’। এই ভাবনাই যেন পরিস্থিতি বদল করতে সাহায্য করলো। তার এইচএসসি পরীক্ষার পর সেবারই প্রথম মেরিন ক্যাডেট হিসেবে নেয়া হয় মেয়েদের।

বলছি চট্টগ্রামের মেয়ে বিউটি আক্তারের কথা। তবে তার এই স্বপ্ন পূরণের গল্পটা এতটা সহজ ছিল না। বিংশ শতাব্দীতে এসেও কটু কথা শুনতে হয়েছে তাকে। অনেক বাধা পেরিয়ে তিনি আজ মেরিন অফিসার (তৃতীয় অফিসার)। এক সমুদ্র জয় করা নারী।

চ্যানেল আই অনলাইন-কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই নারী বলেছেন তার প্রতিকূলতার কথা। শুনিয়েছেন সফলতার গল্প।

চার ভাই-বোনের মধ্যে মেজো বিউটি আক্তার। পিতা মো: বাহার উদ্দিন সরকারি চাকরিজীবী। মা নূরজাহান বেগম গৃহিণী। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০০৯ সালে এসএসসি ও ২০১১ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করার পর পরীক্ষা দেন মেরিন ক্যাডেটে ভর্তির। মেধা তালিকায় সেসময় প্রথম হন তিনি। যোগ দেন ৪৮তম মেরিন ক্যাডেটে। সেবার একসাথে ১৬ জন নারী যোগ দেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেবারই প্রথম মেরিন ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন নারীরা।

সালটা ছিল ২০১২। স্বপ্নপূরণের পথে একধাপ এগিয়ে যান এই নারী। ভীষণ রকম শারীরিক ও মানসিক তীব্র কঠিন পরীক্ষা শেষে ২০১৩ সালে হয় পাসিং আউট প্রোগ্রাম।

প্রশিক্ষণ শেষেই যেন সবচেয়ে বড় মানসিক শক্তির পরীক্ষা দিতে হয় তাকে। যার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না বিন্দুমাত্র। একইসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেয়া পুরুষ সহকর্মীরা সেসময় জাহাজে যাওয়ার সনদ পেলেও নারী বলে আটকে দেয়া হয় ১৬ জনের সনদ। দীর্ঘ ৯ মাস চেষ্টার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের সহায়তায় জাহাজে ওঠার সনদ পান তারা।

জাহাজে উঠলেই যেখানে বেতনভুক্ত হয়ে যাবার কথা সেখানেও নারী বলে হতে হয়েছে বৈষম্যের শিকার। দীর্ঘ ১ বছর বিনা বেতনে করতে হয়েছে চাকরি। ছাড়পত্র দেয়া হয়নি দেশের বাইরে যাবার। আর তাই মোংলা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্তই জাহাজ নিয়ে যাওয়া-আসা করতেন।

১ বছর পর দেন লিখিত পরীক্ষা। সেখানে সফল হবার পর পেয়ে যান দেশের বাইরে যাবার সনদ। তবে এখানেও হতে হয় বাধার সম্মুখীন। একইসাথে কাজ করা পুরুষ সহকর্মীরা যখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সাগর, তখন বিদেশের সমুদ্রে পাড়ি দেয়ার সুযোগ না পাওরায় ‘সি আওয়ার’ গণনা করা হচ্ছিল না তার।

সেসময় ছোট ছোট প্রাইভেট কোম্পানিগুলোতে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন চাকরির জন্য। তবে মেয়ে বলে কেউ চাকরি দিতে চায়নি জাহাজে। শুধু তাই নয়, শুনতে হয়েছে নানা কটু কথাও।

বিউটি আক্তারের ভাষায়: কোনো কোম্পানি নিতে চাইত না। এমন কোনো কোম্পানি নাই যেখানে যাইনি। ছোট ছোট কোম্পানিগুলোও নিতে চাইত না। চাকরিতো পরের কথা, এমনকি সিভিটা পর্যন্ত তারা নিতে চাইত না।

‘‘ভীষণ কটাক্ষ করা হত। কোম্পানির এমডি’রা পর্যন্ত বলতেন মেয়ে মানুষের জাহাজে কাজ কী! অসুস্থ হওয়া ছাড়াতো আর কোনো কাজ নাই। একটা মেয়েকে রাখার চেয়ে দ্বিগুণ স্যালারি দিয়ে একটা ছেলেকে রাখবো।’’

বাদ যাননি স্বজনরাও। বলতেন: ‘অন্ধকার সমুদ্রে জাহাজে কীভাবে কাজ করবে। এই কাজ পারবে না শেষ পর্যন্ত করতে। এত ছেলের মাঝে কীভাবে মেয়েরা কাজ করবে। মেয়েরা কীভাবে জাহাজ চালাবে।’

তবে কারও কোনো কথাই দমাতে পারেনি এ তরুণ অফিসারকে। শেষটা দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। দৃঢ় কন্ঠে বলেন: ‘ল্যান্ডের চেয়ে মেয়েরা জাহাজেই বেশি নিরাপদ।’

এরই মাঝে বাংলাদেশে চলে আসে ৬টি জাহাজ। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে ‘জয়যাত্রা’ জাহাজে প্রথম ওঠেন অফিসার হিসেবে। কাজের সুবাদে গিয়েছেন ইউরোপ বাদে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ। জাহাজে কাজ করতে গিয়ে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা ওভারটাইমও করেন তিনি।

উত্তাল সমুদ্রের যে ভয়ঙ্কর রুপ তার গল্পও শুনিয়েছেন এ কর্মকর্তা।

তার ভাষায়: ‘মাঝে মাঝে ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজ। মনে হয় এই বুঝি ডুবে যাবে। সেসময় জাহাজের জিনিসপত্রও সব একদিক থেকে আরেক দিকে চয়ে যায়। এমনকি নিজেরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাটাও অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় টানা ১৫ থেকে ২০ দিন চলে এমন অবস্থা। তীব্র মানসিক শক্তির পরিচয়  দিতে হয় সেসময়।’

কিছুটা হেসে বিউটি বলেন: ওই মূহুর্তগুলোতে মনে হয় আর কখনও মনে হয় পায়ের তলায় মাটি পাব না।

নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিশ্বের সকল নারীকে আত্মপ্রত্যয়ী এ অফিসার বলেন: মনের টার্গেট ঠিক থাকলে কোনো মেয়ের কাছে কোনোকিছু অসম্ভব না। দমে গেলে চলবে না, চেষ্টা করতে হবে সর্বোচ্চ। আমি পারবো না বা আমার দ্বারা হবে না এটা কখনো ভাবা যাবে না। কোনো নারী যদি এই ভাবনাকে পূঁজি করে চলতে পারে তাহলে তার সফলতা আসবেই।

সূত্র-চ্যানেল আই অনলাইন