» আর কত শোষন করবেন

প্রকাশিত: ২২. আগস্ট. ২০২২ | সোমবার

 

   ।।নীলাঞ্জনা।।

 

চা বাগানের সাথে আমার গভীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে । সব গুলিই ভালোলাগার ভালোবাসার সীমাহীন সুখের ।
আমার কৈশোর কাটিয়েছি চা বাগানে । আমার বাবার চাকরি সুত্রে ।রাজঘাট , আলীনগর এই দুই চা বাগানে বাবা প্রায় ১০/১২ বছর চাকরি করেছেন । আর সেই সুবাদে আমাদের চা বাগানের সাথে নিবিড় ভালোবাসা ।
সবুজে সবুজে ঘেরা চা এর বাগান কে দেখে মনে হত কে যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে । মাঝে মাঝে মনে হত বিশাল বিছানা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আকাশ দেখি । অথবা গড়িয়ে গড়িয়ে যাই এদিক থেকে ওদিকে । এতটাই সমান করে কাটা হত চা এর গাছ গুলিকে ।
আমরা যখন থাকতাম তখন চা বাগানের শ্রমিক গুলিকে বলা হত উড়িয়া । মনে হয় ওরা উড়িষ্যা থেকে এসেছিল।ওরা তখন ভাংগা ভাংগা বাংলাবলত ।ওরা খুব পরিশ্রমী ও বিশ্বস্ত ছিল ।ওদের পোশাক গয়না সব ই ওদের সংস্কৃতিতে আলাদা মাত্রা যোগ পেত । ওরা হাতে বড় বড় রুপার তৈরী বাজুবন্ধ পরত আর পায়ে পরত খারো । নাকে নাকচাবি বা নথ । গলায় হাঁসুলি । ওরা শাড়ি পরত উল্টা করে ডান দিকে আঁচল ঝুলিয়ে । ওদের এই সাজ আমার খুব ভালোলাগত । ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত ওদের আলাদা সংস্কৃতি ছিল । এখন ওরা বাংগালী হয়ে গেছে । শাড়ী আর ওদের মত করে পরেনা । আমাদের মত করে পরেই ওরা চাবাগান থেকে পাতা সংগ্রহ করে ।মাথায় পরে নেয় মাথাল । কথাও বলে এখন বাংলায় এই প্রজন্মের ওরা ।
ওদের খাওয়া দাওয়া দেখলে অবাক হতে হয় যা আমরা কল্পনা ও করতে পারি না । ওরা আটার রুটি বানায় অনেক বড় করে আর সাথে লবন দিয়ে লিকার চা বড় মগ বা বড় থালায় একথালা । এইটাই ওদের প্রধান খাদ্য ।ওরা চা বাগান থেকে কচি পাতা তুলে এর সাথে বুটের ছাতু আর বুট মিশিয়ে একধরণের চানাচুর মাখার মত তৈরী করে তারির সাথে খায় ।
এইগুলি আমরা ও বানিয়ে খেয়েছি । তিতা বিস্বাদ তবু ও আমরা ওদের মত লবন চা দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করতাম । সাথে মায়ের বকুনি ও খেতাম ।
মা যখন ওদের দুপুরের খাবার দিতেন ওরা তরকারী দিয়ে ভাত মেখে খেতনা । ভাত কে নলা করে ডাল বা তরকারিতে ভিজিয়ে মুখে পুরত । এই ভাবে আমরাও খাওয়ার জন্য বায়না করতাম । ভাবতাম কতনা মজার হবে ।

ওরা আমাদের সাহায্য করত নানান কাজে ওদের নাম ছিল সারি ,রাধা দুর্যোধন । রাধা কুয়ো থেকে জল তুলে দিত আমাদের স্নানের আর সব কাজের জন্য ড্রাম ভরে জল রেখে দিত সারাদিনের জন্য ।তারপর গরুর জন্য ঘাস কেটে নিয়ে আসত ।আমাদের কোয়াটারের পাশেই মস্ত একটা ঝিল ছিল । সেই ঝিলের পাশে ছিল ঘন ঘাসের অরন্য আর নানা রংয়ের প্রজাপতির মেলা । ছোট বড় নানা ধরণের প্রজাপতি । রাধার সাথে ঘাস কাটতে আমরা ও যেতাম । আমি আর আমার ছোট বোন । আমরা প্রজাপতির পিছনে দৌড়াতাম প্রজাপতি ধরার জন্য ।
ওদের ছুটির দিন কে বলা হত তলব বার । এইদিনে ওরা মজুরি পায় । মজুরি পেলে ওরা দারুপানি , তারি খেয়ে সারারাত নাচগান হইহুল্লা করে । পরের দিন থেকে আবার যেই সেই ।আমি যখনকার কথা বলছি ৪০ বছর আগের কথা । আমার দেখা বা স্মৃতি থেকে নেয়া।
আমার চা বাগানের প্রতি আলাদা একটা মায়া আছে । সফট কর্ণার আছে । ওদের দুঃখে আমার চোখে ও জল আসে । ওদের কি ভাবে শোষন করা হচ্ছে ওদের নায্য মজুরী থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে । ওরাও স্বাধীন দেশের নাগরীক কিন্তু ওরা এখনো পরাধীন একশ্রেণীর জুলুমবাজ , অর্থগৃধ্নু , অমানবিক চা বাগান মালিকদের কাছে ওরা বন্দি হয়ে আছে ওদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই । ওদের নায্য প্রাপ্তি বুঝিয়ে দেয়ার কেউ নেই ।
এই দ্বাবিংশ শতাব্দিতে এসেও এদের সাথে ব্যাবহার করা হয় প্রস্তর যুগের মত করে । ওরাও মানুষ ওদের ও অধিকার আছে অন্য সাধারণ ১০ জন মানুষের মত জীবনধারণ করার।
ওদের অমানুষিক পরিশ্রম করিয়ে মজুরি দেয়া হয় ১২০ টাকা । ভাবতেও লজ্বা হয় । মানুষ কত খারাপ হতে পারে ! মানুষ কে কষ্ট দিয়ে , ওদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে
কোটি কোটি টাকা লাভ করে কাড়ি কাড়ি টাকা জমিয়ে কি হবে? মৃত্যুর সময় কি সাথে করে কি নিয়ে যেতে পারবে এই বিত্ত বৈভব , টাকা পয়সা !
তাহলে কেন এত বৈষম্য ? কেন এত অমানবিক আচরণ ?
ওরা বেশী কিছু চায়নি । ১২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা চেয়েছে । যা না হলে না হয় ! ৫০০ বা হাজার চায়নি ।
আসুন আমরা সাধারণ মানুষরা ওদের সাথে সামিল হই । ওদের দাবি যাতে ফলপ্রসু হয় আমরাও যেন চেষ্টা করি ।
মানুষ অর্থ যার হুঁশ আছে ।
চা বাগানের মালিকদের বলছি আপনাদের হুঁশ ফিরুক সত্যিকারের মানুষ হউন ওদের প্রাপ্য ওদের বুঝিয়ে দিন ।
আর কত শোষন করবেন ?
অনেক তো হল ।