» অন্য হাসপাতালের চিকিৎসকরা যখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তখন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মুগদা হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা

প্রকাশিত: ১১. মে. ২০২০ | সোমবার

জাতির সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম।।
২৪ এপ্রিল রাত ৮টায় হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. খন্দকার রোকসানা মমতাজ সুমনার। দ্রুত হাসপাতালে আসার জন্য তাকে জানানো হয়। তিনি এসে দেখেন করোনাভাইরাস আক্রান্ত হাজারীবাগ এলাকার এক গর্ভবতী নারী প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছেন।

স্বজনরা জানান, কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে শেষ ভরসায় তারা এখানে এসেছেন।

হাসপাতালের পরিচালক, কভিড-১৯ চিকিৎসক কমিটি এবং দায়িত্বরত চিকিৎসকরা মিলে সিদ্ধান্ত নেন অপারেশনের। নয়তো মা এবং সন্তান দুজনই মারা যাবে। অবশেষে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপারেশন শুরু করেন ডা. সুমনা ও তার টিম।

সফল অপারেশনে জন্ম হয় নবজাতকের, হাসি ফোটে মায়ের মুখে। পরপর দুটি সিজারিয়ান অপারেশনই সফল হয়। তৃতীয় দিন আরেক করোনা আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের অপারেশন করেন তারা। নবজাতক সুস্থ থাকলেও পরবর্তীতে মারা যান ওই নারী। মায়ের শেষ নিঃশ্বাস, চিকিৎসকদের জীবন ঝুঁকির বিনিময়ে পৃথিবীর আলো দেখেছে নতুন প্রাণ।
এ পরিস্থিতিতে অন্য হাসপাতালের চিকিৎসকরা যখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তখন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এই ১৭ দিনের ব্যবধানে ১১ জন করোনা আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের সিজারিয়ান অপারেশন করেছেন তারা। এর মধ্যে দুজন মা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। বাকি সবাই সুস্থ আছেন। অপারেশনে অংশগ্রহণকারী চিকিৎসকদের করোনা টেস্ট নেগেটিভ এসেছে, তারাও সুস্থ আছেন। এর মধ্যে ছয়টি অপারেশনে ছিলেন হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. খন্দকার রোকসানা মমতাজ সুমনা। তিনি বলেন, প্রথম দিকে দুশ্চিন্তা হচ্ছিল। রোগী এবং আমাদের ঝুঁকি ছিল। আমার সঙ্গে ছিলেন আবাসিক সার্জন ডা. আমিতুন নেসা শিখা, অবেদনবিদ ডা. মফিজুর রহমান সবুজ ও ডা. অনিক। অপারেশন শুরুর পর দুশ্চিন্তা মাথা থেকে উবে যায়। আমাদের লক্ষ্য ছিল এই প্রাণ দুটি বাঁচানো। এ পর্যন্ত ছয়টি অপারেশনে আমি ছিলাম। করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তো থাকবেই। তবে সঠিকভাবে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম পরলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। সব কিছু তো সৃষ্টিকর্তার হাতে।
দুঃসাহসী এই গল্প শোনাতে গিয়ে ডা. সুমনা বলেন, একজন রোগীর কাশি একটু বেশি ছিল, সঙ্গে শ্বাসকষ্টও ছিল। তাকে এনেসথেসিয়া দেওয়া যাচ্ছিল না। পরে অবস্থা ভালো হলে অপারেশন শুরু হয়। পুরোটা সময় অবেদনবিদ ডা. অনিক রোগীর হাত ধরে ছিলেন। সফলভাবে নবজাতককে বের করে নিয়ে আসি আমরা। কিন্তু পরবর্তীতে রোগীর কাশি এবং শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। আরেকটি রোগীরও একই পরিস্থিতি ছিল। আরেক গর্ভবতী মায়ের পাঁচ মাস পার হতেই পেটের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন। সিজারিয়ান অপারেশন ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। অপারেশনের পরে মা সুস্থ হলেও অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় ওই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। অপারেশনের সময় দুটি পিপিই ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী পরে খুব কষ্ট হচ্ছিল। তবু জীবন বাঁচাতে আমরা সর্বোচ্চ দিয়ে লড়েছি।
মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ এবং হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক শাহ গোলাম নবী তুহিন বলেন, ‘গর্ভবতী একজন মা প্রসব ব্যথায় কাতরাচ্ছেন, তাকে কীভাবে ফিরিয়ে দেব। আমিও তো কোনো মায়ের সন্তান। আর এখানে রোগী একজন নয়, দুজন। দুটো প্রাণ বাঁচাতে আমাদের চিকিৎসকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়েছেন। ’ মুগদা জেনারেল হাসপাতালের কভিড-১৯ বিষয়ক চিকিৎসক কমিটির সভাপতি ডা. মনিলাল আইচ বলেন, ‘আমরা রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্সদের সমন্বয়ে কমিটি করেছি। পীড়িত রোগীদের সর্বোত্তম সেবা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করছি। আমাদের হয়তো সীমাবদ্ধতা আছে, তবু যেটুকু আছে তাই নিয়ে আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। ’ মুগদা জেনারেল হাসপাতালের কভিড-১৯ বিষয়ক কমিটির সদস্য সচিব ও ফোকাল পারসন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, মানুষ হিসেবে কোনো মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া মানবতা নয়। জীবন বাঁচাতে লড়ে যাওয়াই তো এ পেশার ধর্ম।